প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬
৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার মেজর মোজাফফর
মোঃ জাকারিয়া হোসেন ||
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন। বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানীর একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ তাকে আটক করে। পরদিন বৃহস্পতিবার তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তৎকালীন মেজর পদমর্যাদার এই কর্মকর্তার বর্তমান বয়স ৭৭ বছর। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান হত্যার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।ডিএমপির ১৬ জুলাই প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে জানানো হয়। পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়।ডিএমপি তাকে জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগে বা কোন সামরিক কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। গ্রেপ্তারের পর মোজাফফরের কোনো বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়নি।জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে মোজাফফরের নাম উঠে এসেছে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড বইয়ের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ভোরে গোলাগুলির শব্দে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তার সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। বইটিতে উল্লেখ করা হয়, সে সময় মোজাফফর দৃশ্যত কাঁপছিলেন এবং মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাদের ধারণা ছিল, জিয়াকে হত্যা নয়, সার্কিট হাউস থেকে নিয়ে যাওয়া হবে।এরপর বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সামনে এসে সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়াউর রহমানকে গুলি করেন। বইয়ে আরও বলা হয়েছে, পরে সার্কিট হাউস থেকে ফেরার পথে মোজাফফর তার এক সঙ্গীকে বলেছিলেন, তিনি জানতেন না রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে; তার ধারণা ছিল, শুধু তাকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে এটি মাসকারেনহাসের বইয়ে উল্লেখিত বর্ণনা, আদালতে শপথ নিয়ে দেওয়া বা জেরার মাধ্যমে যাচাই করা সাক্ষ্য নয়।একই বইয়ে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে আবার সার্কিট হাউসে যান। সেখানে জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে গোপন কাগজপত্র ও ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়। পরে জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে নেওয়া হয়।বইটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন। ফলে হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকে জানতেন না—মোজাফফরের এমন দাবির সঙ্গে তার পরবর্তী ভূমিকা নিয়েও প্রশ্নের কথা বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে মঞ্জুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ত্যাগ করেন। মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, সামনের জিপে ছিলেন মতিউর রহমান, মাহবুব, মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর ও মাহবুব নিহত হন, মুনীর গ্রেপ্তার হলেও মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।জিয়া হত্যার পর বিদ্রোহের অভিযোগে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। এর মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যান এবং তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। মোজাফফরের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে আলাদা কোনো রায় হয়েছিল কি না বা কোনো সামরিক পরোয়ানা এখনো কার্যকর আছে কি না, সে বিষয়ে সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক বইয়ে মোজাফফরের পলাতক জীবনের কিছু তথ্য উঠে এসেছে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ২০১৪ সালে দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বইটির সংশ্লিষ্ট অংশের ইংরেজি অনুবাদ উদ্ধৃত করেন।মইনুল হোসেন লিখেছেন, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি জানতে পারেন, মেজর খালেদ ব্যাংককে এবং মোজাফফর ভারতে অবস্থান করছিলেন। পরে মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেন।তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মইনুল লেখেন, চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াকে সার্কিট হাউস থেকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনায় নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, মাহবুব ও মেজর খালেদ। তাদের দাবি ছিল, জেনারেল মঞ্জুর আগে থেকে পরিকল্পনার বিষয়ে জানতেন না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জিয়াকে চাপ দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও কয়েকজন মন্ত্রীকে অপসারণ করানো।মইনুলের বইয়ে আরও বলা হয়েছে, জিয়া কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর মতিউর রহমান খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেন। অন্য কর্মকর্তারা আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যান এবং গুলি চালাননি। বইটিতেও মোজাফফরকে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে খালেদ ও মোজাফফরের বক্তব্য আলাদাভাবে উপস্থাপন না করায় কোন তথ্যটি কার, তা স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি তারা দুজনই তখন পলাতক অভিযুক্ত ছিলেন এবং তাদের বক্তব্য আদালতে জেরা বা স্বাধীন সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই হয়নি।মইনুল আরও লিখেছেন, ১৯৯১ সালে ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই আলোচনার বিষয়টি জানান। পরে ১৯৯৩ সালে ব্যাংককে হৃদ্রোগে মারা যান মেজর খালেদ। ফলে ওই বৈঠকের দুই পলাতক প্রত্যক্ষদর্শীর মধ্যে পরবর্তীতে মোজাফফরই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ছিলেন।সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জিয়া হত্যার পর মোজাফফর ভারতে আত্মগোপন করেছিলেন এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করতেন। তবে ডিএমপির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে শুধু বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন।তিনি কত বছর ভারতে ছিলেন, কোথায় ও কী পরিচয়ে অবস্থান করতেন, কীভাবে ব্যাংককে যাতায়াত করেছেন, কবে দেশে ফিরেছেন এবং বনানীতে কতদিন ও কার সহায়তায় আত্মগোপনে ছিলেন—এসব বিষয়ে কোনো সরকারি সংস্থা তথ্য দেয়নি। কিছু সূত্রের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই দেশে অবস্থান করছিলেন।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর মোজাফফরের গ্রেপ্তারের ঘটনায় জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথি কিংবা পুরোনো সামরিক তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখিত তথ্য এবং পুলিশের বর্তমান অভিযোগ—উভয়ই এখন আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত