প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬
১০ সন্তানের বাবা-মা, তবু অভাবে দিন কাটে ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন বৃদ্ধ দম্পতির
মোঃ জাকারিয়া হোসেন ||
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের বানিয়াগাঁতী গ্রামের ৯০ বছর বয়সী আছাব আলী ও তার ৮০ বছর বয়সী স্ত্রী সালেকা বেগম বার্ধক্য, অসুস্থতা ও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়েসহ ১০ সন্তানের বাবা-মা হয়েও তাদের দুবেলা খাবারের জন্য প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্তানদের মানুষ করে প্রতিষ্ঠিত করলেও জীবনের শেষ সময়ে তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না।জানা যায়, ভদ্রঘাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বানিয়াগাঁতী গ্রামেই বসবাস করেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আছাব আলী প্রায় চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়েছেন। নিজের দৈনন্দিন কাজও অন্যের সহায়তা ছাড়া করতে পারেন না। অন্যদিকে, নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগলেও স্বামীর দেখভালের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন সালেকা বেগম। কখনো স্বামীকে ধরে বাইরে নিয়ে যান, আবার কখনো মানুষের দ্বারে গিয়ে সাহায্যের আবেদন করেন।স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় কঠোর পরিশ্রম করে আছাব আলী সন্তানদের বড় করেছেন। তাদের লেখাপড়া, বিয়ে এবং সংসার গুছিয়ে দিতে জীবনের সবটুকু শ্রম ব্যয় করেছেন। কিন্তু শেষ বয়সে এসে সেই সন্তানদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে চরম সংকটে রয়েছেন তারা।প্রতিবেশীরা জানান, তাদের বসতঘরও অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। টিনের ছাউনি ও বেড়ার বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। নেই ভালো শৌচাগার কিংবা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। বাঁশের তৈরি একটি মাচার ওপর চট বিছিয়ে রাত কাটাতে হয় তাদের। বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে প্রতিটি দিন তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে।স্থানীয় বাসিন্দা জুরান আলী বলেন, আছাব আলী ও সালেকা বেগমের ১০ জন সন্তান থাকলেও কেউ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিচ্ছেন না। ফলে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থাও তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে।প্রতিবেশী মরিয়ম বেগম বলেন, তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করার চেষ্টা করেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই দম্পতির পাশে সমাজের সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন।আরেক প্রতিবেশী কামাল শেখের মতে, এত সন্তান থাকার পরও বাবা-মায়ের এমন পরিস্থিতি দুঃখজনক। এই বয়সে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সন্তানদের সেবা ও যত্ন।এদিকে সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস জানান, স্থানীয়ভাবে প্রায় ৭০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আছাব আলী ও সালেকা বেগমের জন্য একটি চলাচল-উপযোগী হুইলচেয়ার বা সহায়ক যান, খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের সামান্য সহযোগিতাও তাদের শেষ জীবনকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে।সহায়তার আবেদন জানিয়ে সালেকা বেগম বলেন, “আমরা আর কিছু চাই না বাবা। শুধু দুবেলা ভাত খেয়ে, একটু শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই। আল্লাহ যেন সবাইকে ভালো রাখেন।”
ভদ্রঘাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সোহাগ মণ্ডল জানান, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের বয়স্ক ভাতার কার্ড করা হয়েছে এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—১০ জন সন্তান থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে তাদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ এগিয়ে এলে তারা জীবনের শেষ সময়টুকু আরও সম্মানের সঙ্গে কাটাতে পারবেন।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত