প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
যাত্রীছাউনির দখলে হকার, সড়কেই বাসের অপেক্ষায় যাত্রীরা
মোঃ জাকারিয়া হোসেন ||
রাজধানীতে যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়কভাবে বাসের অপেক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলোর বড় অংশ এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কোথাও হকারের দখল, কোথাও ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থল, আবার কোথাও দোকান কিংবা ময়লার স্তূপে পরিণত হয়েছে এসব ছাউনি। অনেক স্থানে বাসও নির্ধারিত স্টপেজে থামে না, ফলে যাত্রীদের সড়কের ওপর দাঁড়িয়েই বাসে ওঠানামা করতে হচ্ছে।গত কয়েক বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছে। এসব যাত্রীছাউনির পরিকল্পনা করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), আর নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো নিশ্চিত করার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। তবে সমন্বয়ের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে অধিকাংশ যাত্রীছাউনি কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না।ডিটিসিএর বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির নকশা ও ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ২২৯টি স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬১টি স্থান নির্ধারণ করা হয়।এ পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রায় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছে, যেখানে প্রতিটির গড় নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১২ লাখ টাকা। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে রয়েছে ৪৪টি যাত্রীছাউনি, যার প্রতিটির গড় ব্যয় প্রায় ৭ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কের দুই পাশে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি আধুনিক যাত্রীছাউনি নির্মাণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ভিনাইল ওয়ার্ল্ড’।সরেজমিনে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, গুলিস্তান, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, দোলাইরপাড়, মহাখালী, বিমানবন্দর সড়ক, কুড়িল, মালিবাগ ও আজিমপুর এলাকায় অধিকাংশ যাত্রীছাউনির একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক স্থানে লোহার রেলিং খুলে নেওয়া হয়েছে, টেম্পার্ড গ্লাস ভেঙে গেছে এবং বসার বেঞ্চও নেই। কোথাও ফল ও চায়ের দোকান, কোথাও আবর্জনার স্তূপ, আবার কোথাও ভবঘুরেদের অবস্থান দেখা গেছে।বছিলা এলাকায় একটি যাত্রীছাউনি প্রায় দুই বছর ধরে টেম্পোস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামনে ডিপিডিসির বড় কেবল রিল রাখায় ছাউনিটি প্রায় আড়াল হয়ে গেছে। মোহাম্মদপুরের একটি যাত্রীছাউনির পাশে ময়লার স্তূপ, অন্য পাশে মুদি ও সবজির দোকান রয়েছে। আল্লাহ করিম মসজিদের বিপরীত পাশের যাত্রীছাউনিটিও হকারদের দখলে।ধানমণ্ডি-১৫, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব মোড়, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও মিরপুর সড়কের যাত্রীছাউনিগুলোর কোনোটিই কার্যকর বাসস্টপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। শাহবাগ ও রমনা পার্ক এলাকার কয়েকটি যাত্রীছাউনিতে ভ্রাম্যমাণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।আবার এমন অনেক স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে নিয়মিত বাস থামে না বা যাত্রী চলাচল কম। বিপরীতে মিরপুরের আনসার ক্যাম্প, মতিঝিল, রামপুরা ও বাড্ডার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় যাত্রীছাউনি কম রয়েছে।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, যাত্রীছাউনির মূল উদ্দেশ্য হলো যাত্রীদের রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নির্ধারিত বাসস্টপ থেকে ওঠানামার সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস নির্ধারিত স্টপেজে না থামায় পুরো ব্যবস্থাই কার্যকারিতা হারিয়েছে।মোহাম্মদপুর-বিমানবন্দর সড়কের বাসচালক শহিদ মিয়া বলেন, যাত্রীরা বিভিন্ন স্থানে বাস থামাতে চাপ দেন। একই সঙ্গে যাত্রী তুলতে চালকরাও নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামান।বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর অভিযোগ, অনেক চালক ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারিত বাসস্টপ এড়িয়ে চলেন। যাত্রীছাউনি দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়ম মেনে পরিচালনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন, ডিটিসিএ ও ট্রাফিক পুলিশের হলেও কোনো সংস্থাই কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছে না।অন্যদিকে দুই সিটি করপোরেশন বাসস্টপ সচল না থাকার জন্য ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছে।ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান বলেন, মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা নিয়মিত নয়। বাসস্টপে বাস না থামলে দখল প্রতিরোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং) রাজীব খাদেম জানান, যাত্রীছাউনি নির্মাণ ও ট্রাফিক সাইন স্থাপনের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। তবে পরে আবার দখল হয়ে যায়। উত্তর সিটি করপোরেশনও স্বীকার করেছে যে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে না। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মতে, বাজেটসংকটের কারণে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান সম্ভব হচ্ছে না।ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান বলেন, বাস রুট ব্যবস্থাপনা ও নির্ধারিত স্টপেজ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক বাস পরিচালনাসহ বিভিন্ন কারণে দ্রুত সমাধান সম্ভব হচ্ছে না।ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, জনবল সীমিত থাকায় মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, সমন্বয় এবং বাসস্টপ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলোর কার্যকর ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি রাজধানীর সব যাত্রীছাউনির অবস্থা পর্যালোচনা করে সেগুলোকে যাত্রীবান্ধব ও ব্যবহারোপযোগী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত