প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
তিস্তা ব্যারাজে নতুন সম্ভাবনা, পানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা
মোঃ জাকারিয়া হোসেন ||
তিস্তা ব্যারাজ ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন উদ্যোগকে দেশের উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন সম্ভাব্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এ বাস্তবতায় তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সময়ের সঙ্গে প্রকল্পটি শুধু অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা নিয়ে চীনের ইতিবাচক আগ্রহ ও নীতিগত সমর্থনের বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে।বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে সাত লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তিস্তা এখন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।আন্তর্জাতিক পানি আইনের আলোকে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারে ন্যায্যতা ও ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নীল, মেকং এবং টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অভিজ্ঞতার আলোকে বলা হয়েছে, আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব।বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা চললেও ২০১১ সালের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ কারণে তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এ অবস্থায় তিস্তা ব্যারাজের আধুনিকায়ন এবং বৃহত্তর তিস্তা প্রকল্পকে দেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সেচ নিশ্চিত করা গেলে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়তে পারে। পাশাপাশি বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, পর্যটন, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকল্পটিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে উল্লেখ করা হয়েছে, তিস্তা ব্যারাজ কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন, কার্যকর কূটনীতি এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত