প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬
মোঃ জাকারিয়া হোসেন ||
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।তিনি বলেন, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে শোকাহত করেছে। তবে এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনের পথ চলতে হবে। একই সঙ্গে আহতদের সাহস, ধৈর্য ও দৃঢ়তা থেকে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।সোমবার (২১ জুলাই) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারিতে আয়োজিত ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্মরণসভা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো আমাদের ভাই-বোন ও ছোট্ট শিশুদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। মহান আল্লাহ তাদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।তিনি নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরিয়ান, মরিয়ম, ওয়াকিয়া, রাইসা, মনিব, বোরহানউদ্দিন, বাপ্পি, শারিয়া আক্তার, নুসরাত জাহান আনিকা, সাইমা আক্তার, হুমায়ুন নূর, ফাতেমা, মোহাম্মদ জুনায়েদ হাসান, সাদ শাফিয়াউদ্দিন, তাসনিম আফরোজ, মাহিদ হাসান, আব্দুল্লাহ শামিম, তাহিয়া আশরাফ, নাজিয়া, মাহতাব রহমান, শায়ান ইউসুফ, তারিফ ফারহান, মোহাম্মদ আফনান ফয়াজ, শামিউল করিম, আব্দুল মুসাব্বির মাহমুদ, চান্দ মারমা, সাহিল ফারাবি, আরিয়ান মাহিয়া, তাসলিম, তাসনিয়া হক ও তানভীর আহমেদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।এছাড়া তিনি রজনী ইসলাম, লামিয়া আক্তার, আফসানা প্রিয়া, কো-অর্ডিনেটর মেহরিন চৌধুরী, সিনিয়র শিক্ষক মাসুকা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক মাহফুজা খাতুন এবং কর্মচারী মাসুমা বেগমকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।তিনি বলেন, আজকের দিনটি পুরো জাতির জন্য গভীর শোকের। আকস্মিক এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি দেশবাসী সমবেদনা জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের প্রতি আমি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করছি।আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার পরও আপনারা যে সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছেন, তা জাতি আজীবন স্মরণে রাখবে। শোকের মধ্যেও আপনাদের এই মানসিক শক্তি সত্যিই অনুপ্রেরণার।তিনি আরও বলেন, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় আপনাদের সাহস জোগাবে। পাশাপাশি অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও তৈরি করবে। আপনাদের মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আত্মবিশ্বাস জাতির জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির সময় উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রশংসা করেন ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসক, নার্স, স্বেচ্ছাসেবক, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), রহমান ফাউন্ডেশন এবং জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান।একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।তিনি বলেন, সংকটের সেই সময়ে অসংখ্য মানুষ নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অন্যদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবতার এমন দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। সেদিন প্রমাণ হয়েছে, মানুষের জন্য মানুষ এখনও নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে।ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা একা নন। কঠিন সময়ে যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পেয়েছেন, সেই সমর্থন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দেশের মানুষ আপনাদের দুঃখে পাশে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।বক্তব্য শেষে তিনি আহত ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুলে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি দেশের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। তিনি শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরীর আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও তিনি আগুনে দগ্ধ শিশুদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়েছিলেন।মন্ত্রী আরও বলেন, সেই সংকটময় সময়ে সিঙ্গাপুর, ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকেরা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যা মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে দেশের চিকিৎসকেরাও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের একটি প্রতিনিধি দল বার্ন ইউনিটের স্কিন ব্যাংক ও চিকিৎসকদের দক্ষতার প্রশংসা করেছে বলেও জানান তিনি।নিহত ও আহতদের পরিবারের দাবির বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান তাদের বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়ে পুনর্বাসন ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উন্নয়নশীল দেশের সরকারের পক্ষে এককভাবে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। তাই বার্ন প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত দেশগুলো সচেতনতার মাধ্যমে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে।নিহত কো-অর্ডিনেটর মাহেরিন চৌধুরীর স্বামী বলেন, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির দায় কার—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এক বছর পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে কারা দায়ী, তা জানা যায়নি। তিনি বলেন, মাহেরিন নিজের জীবন দিয়ে কোমলমতি শিশুদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেও প্রাণ হারান। তিনি আরও জানান, মাহেরিন চৌধুরী ছিলেন তারেক রহমানের চাচাতো বোন। বিষয়টি পরিবার শুরুতে চাপা রাখতে চাইলেও পরে তা গণমাধ্যমে আসে। বর্তমান সরকারের কাছে তাদের দাবি, অন্তত একবার যেন নিহত ও আহত পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের কষ্টের কথা তুলে ধরতে পারেন। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক আশ্বাস দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে দগ্ধ শিক্ষার্থী আবিদুর রহমান আবিদ বলেন, টিফিনের সময় একটি বিমান স্কুলের ওপর আছড়ে পড়ার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত আজও ভুলতে পারেননি। তিনি জানান, আগের তুলনায় তার শারীরিক অবস্থা অনেক বদলে গেছে। অনেকেই আরও গুরুতর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যাদের হারিয়েছেন, সেই শোক বহন করাও কঠিন।ডা. জুবাইদা রহমানকে উদ্দেশ করে আবিদ বলেন, তার উপস্থিতিতে তারা আনন্দিত। তবে প্রধানমন্ত্রীও যদি তাদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং সান্ত্বনা দিতেন, তাহলে আরও ভালো লাগত। চিকিৎসকদের চেষ্টা ও আল্লাহর রহমতে তিনি অনেকটাই সুস্থ হলেও বাম হাত এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। চিকিৎসকেরা অপারেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তিনি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান এবং সবার কাছে নিহতদের জন্য দোয়া কামনা করেন।স্মরণসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, ড্যাবের সভাপতি ডা. হারুনুর রশীদ, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং উপস্থাপক হিসেবে ছিলেন ডা. শাওন বিন রহমানসহ জাতীয় বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা।অনুষ্ঠানে আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে সহায়তাকারী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
শেষে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এতে নিহতদের স্বজন, আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।