প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬
ভারতের জেন-জি আন্দোলনে নতুন সমীকরণ, জাত-ধর্মের বিভাজন পেরিয়ে বিস্তৃত জনসম্পৃক্ততা
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
ভারতের নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীদের দাবিকে ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে এখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের বিভিন্ন আন্দোলনের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি বেশ ভিন্ন।ভারতের গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক বড় আন্দোলন দেখা গেলেও সেগুলোর বেশিরভাগই নির্দিষ্ট অঞ্চল, সম্প্রদায় বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তবে বর্তমান আন্দোলনে সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই অনুপস্থিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।বিশ্লেষণে ২০১৫ সালের পাটিদার আন্দোলন, ২০১৯-২০ সালের সিএএ-বিরোধী আন্দোলন এবং ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, সেসব আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা মূলত নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু বর্তমান আন্দোলনে উচ্চবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি জাত বা ধর্মের পরিচয়ের পরিবর্তে তরুণদের ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হয়েছে।প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা ভারতের জেন-জি প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলেছে। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ড্রোন নজরদারি, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের মধ্যেও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল, বলিউডের কয়েকজন তারকা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশাজীবীরাও আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। দিল্লির রাজপথ থেকে শুরু হয়ে এই বিক্ষোভ মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের মধ্যেও এ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতারা দাবি করেছেন, বিরোধী দলগুলোর উস্কানি ও অজ্ঞাত অর্থায়নে 'ককোরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-এর আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। মহারাষ্ট্র বিজেপির সভাপতি রবীন্দ্র চভন এবং রাজ্য রাজস্বমন্ত্রী চন্দ্রশেখর বাওয়ানখুলে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীকে দায়ী করার ভিত্তি কী।এদিকে আন্দোলন অব্যাহত থাকায় বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। বলিউড অভিনেত্রী হুমা কুরাইশি, অভিনেতা ইমরান খান এবং সংগীতশিল্পী মিকা সিংও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। মিকা সিং পুলিশের লাঠিচার্জের সমালোচনা করেন। এছাড়া কিছু তারকার নীরবতার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ফ্যান পেজ বন্ধ হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন সরকারের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে সমালোচনা, নেতৃত্ব ছাড়াই শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, আন্দোলনকারীদের নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না থাকা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি তরুণদের অসন্তোষ এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
সূত্র: ইনকিলাব
ছবি: সংগ্রহ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত