প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬
রাজনীতিবিদ না আমলা—কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট?
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
পদত্যাগ করছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। পদত্যাগের পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে কিছু সময় লাগতে পারে। এ সময় পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হওয়ায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কে হবেন।বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দলটির বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একজন সিনিয়র নেতাকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। এ কারণে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন মহলে দলের বাইরের কাউকে রাষ্ট্রপতি করার গুঞ্জন থাকলেও ওই সূত্র তা নাকচ করে জানিয়েছে, দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি একজন রাজনীতিবিদই হবেন।দলের এক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে দলের অভিজ্ঞ ও সিনিয়র কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েই আলোচনা চলছে।দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় তিন বছর তিন মাস পর পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তাকে অপসারণের দাবি জোরালো হয়। তাকে অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বঙ্গভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরামর্শে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়নি। যদিও রাষ্ট্রপতিকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আবারও রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হলেও বিএনপির নেতৃত্ব বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে ছিল। তার মেয়াদের এখনও দেড় বছর বাকি থাকায় এতদিন এ বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা হয়নি।কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরের সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি ৯ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত লন্ডনে অবস্থান করেন। ওই সময়ে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।এ বিষয়ে অনেকের মত, অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই যোগাযোগ শপথ ভঙ্গের শামিল। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে তিনি এখনও ফ্যাসিস্টদের পক্ষেই কাজ করছেন। ফলে তাকে রাষ্ট্রপতির পদে বহাল রাখার সুযোগ নেই বলে তারা মনে করছেন।শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়। তাকে পদত্যাগের প্রস্তুতি নিতে বলা হয় এবং জুলাই মাসের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার সরকারি ইচ্ছার বিষয়টিও জানানো হয়।সরকারি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতিকে আপাতত সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন এবং সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত কিংবা পারিবারিক কারণ উল্লেখ করতে পারেন। সরকারের অবস্থান জানার পর তিনি পদত্যাগের প্রস্তুতি শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।বঙ্গভবন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আজ বা আগামীকালের মধ্যেই তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠাতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দেবেন।স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদেশে থাকায় এক-দুই দিনের বিলম্ব হতে পারে বলে আলোচনা থাকলেও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে আজই দেশে ফিরছেন। দেশে ফেরার পরই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হতে পারে।এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সারওয়ার আলম মানবজমিনকে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দেওয়ার মধ্য দিয়েই বঙ্গভবনে সাহাবুদ্দিন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে। দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি প্রায় তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালন করেছেন।রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলেও পদটি শূন্য থাকবে না। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।সংবিধান অনুযায়ী, পদত্যাগের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশন দুই মাস পর বসার কথা রয়েছে। তখন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে সরকার চাইলে জরুরি অধিবেশন ডেকেও এর আগে নির্বাচন আয়োজন করতে পারে।এদিকে, সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি কে হবেন—তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নাম আলোচনায় আসে। বিষয়টি সামনে আসে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি ফেসবুক পোস্টের পর। সেখানে তিনি লেখেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নাম পছন্দের তালিকায় রয়েছে।ওই পোস্টের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।নাসিমুল গনি বিএনপি সরকারের সময় প্রভাবশালী আমলা ছিলেন এবং জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনে। প্রথমে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুক্তিভিত্তিক মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।তবে বিধি অনুযায়ী তার রাষ্ট্রপতি হওয়া সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, চাকরিরত মন্ত্রিপরিষদ সচিব সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে হলে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়।অন্যদিকে, বিএনপির ভেতরে এমন আলোচনাও রয়েছে যে, রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পরিবর্তে অরাজনৈতিক কাউকে দায়িত্ব দিলে অতীতে দলের জন্য ইতিবাচক ফল আসেনি। এ ক্ষেত্রে অনেকেই সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের উদাহরণ টানছেন।নতুন রাষ্ট্রপতি রাজনীতিবিদ হবেন নাকি আমলা—এ বিষয়ে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে কথা বলে মানবজমিন জানতে পেরেছে, দলের একজন সিনিয়র নেতাই বঙ্গভবনে যাচ্ছেন। কোনো আমলার এ পদে আসার সম্ভাবনা কম বলেও তারা মনে করছেন। তাদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের পরীক্ষিত একজন নেতাকেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া উচিত।দলীয় সূত্রের দাবি, সম্ভাব্যদের তালিকায় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া নজরুল ইসলাম খানের নামও কেউ কেউ উল্লেখ করছেন। এই তালিকা থেকেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’এদিকে, মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।’রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন মানবজমিনকে বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
সূত্র: মানবজমিন
ছবি: মানবজমিন
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত