প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬
ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার চেয়েও বিচারপতিদের দায় বেশি ছিল। তার দাবি, বিচার বিভাগের ভূমিকার কারণেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যার ওপর ভর করে দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতি, চাটুকারিতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে অবস্থান পরিবর্তনের প্রবণতাকে তিনি রাষ্ট্রীয় সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।শনিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।মাহমুদুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার চেয়ে যদি কারও বেশি দায় থেকে থাকে, তবে তা বিচারপতিদের। তার ভাষায়, বিচার বিভাগের তৈরি করা পরিবেশের কারণেই দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিচারপতিদের এমন ভূমিকার পেছনে ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতি বড় কারণ, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে।বিচার বিভাগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে মানুষের চরিত্র বদলে যায়। তার মন্তব্য, যদি তিন মাস বিচার বিভাগ বা হাইকোর্ট কার্যক্রম বন্ধও থাকত, তাতেও দেশের তেমন ক্ষতি হতো না। উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় কয়েক দিন পুলিশ না থাকার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ওই সময়ও দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেনি। তার মতে, এতে বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক আচরণের একটি ইতিবাচক দিক ফুটে ওঠে।নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, কুষ্টিয়ায় আদালত চত্বরে হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগ কিংবা সুশীল সমাজের কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ পাননি। তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে ১২৫টি মামলা থাকায় বিভিন্ন জেলায় আদালতে হাজিরা দিতে হতো। এসব মামলা ঢাকায় স্থানান্তরের আবেদন করলেও কোনো বিচারপতি তা গ্রহণ করেননি।তিনি আরও বলেন, হামলায় আহত হওয়ার পরদিনও তাকে সুনামগঞ্জে আদালতে হাজিরা দিতে হতো। আগাম জামিনের জন্য হাইকোর্টে গেলে একজন বিচারপতি তাকে বলেন, ‘আপনার চেহারা দেখতে আমাদের ভালো লাগে না। আপনি আর কখনো হাইকোর্টে আসবেন না।’ তার মতে, এ ধরনের মন্তব্য বিচার বিভাগের তৎকালীন অবস্থারই প্রতিফলন এবং এসব কারণেই দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরাও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একজন রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর পায়ের ধুলা আর নিতে পারবেন না বলে তার দুঃখ হচ্ছে।তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, যিনি শেখ হাসিনার পায়ের ধুলা নিতে পেরেছেন, তিনি চাইলে তারেক রহমানের পায়ের ধুলাও নিতে পারতেন, তাহলে হয়তো পদত্যাগ করতে হতো না। তার মতে, ব্যক্তি পূজা ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে এবং এ কারণেই তিনি অনেকের অপছন্দের ব্যক্তি, কারণ তিনি অপ্রিয় সত্য কথা বলেন।নিজেকে একজন ভুক্তভোগী উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগত বিষয় সাধারণত প্রকাশ করেন না, তবে প্রসঙ্গক্রমে তা বলতে হয়েছে। তিনি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন এবং অন্যদেরও সত্য তথ্য নিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানান।বিএনপির সঙ্গে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জনসভায় গেলে ‘আমার দেশ’-এর একটি কপি সঙ্গে রাখতেন এবং বক্তব্যে সেখানকার সংবাদ উদ্ধৃত করতেন। সে সময় সরকারপক্ষ ‘আমার দেশ’কে বিএনপির পত্রিকা বলে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।তিনি আরও বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে যখন অনেকেই নীরব ছিলেন, তখন ‘আমার দেশ’ এটিকে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি হিসেবে উল্লেখ করেছিল, যা পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আটজন ভুক্তভোগীর কাহিনি ‘আমার দেশ’ প্রকাশ করলেও অন্য কোনো সংবাদপত্র তা প্রকাশ করেনি।বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রকে অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রিত উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন স্বার্থের কারণে তারা ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে পারে না। তবে ‘আমার দেশ’-এর কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ না থাকায় তারা নিজেদের অবস্থান থেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।তিনি আরও বলেন, যে বিএনপি একসময় ‘আমার দেশ’কে নিজেদের ঘনিষ্ঠ পত্রিকা মনে করত, বর্তমানে ক্ষমতায় এসে সেই দলই পত্রিকাটিকে জামায়াতের পত্রিকা বলে আখ্যা দিচ্ছে। তার মতে, সরকারকে সমালোচনা করলেই এ ধরনের তকমা দেওয়া হয় এবং ক্ষমতায় গেলে সবাই প্রশংসা শুনতে চায়।আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘নেভার এগেইন’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে আর গণহত্যা না ঘটে। কিন্তু তার দাবি, বর্তমানে যাদের জন্য সেই অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তারাই অন্যদের ওপর একই ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, হিটলারের জার্মানি ও বর্তমান ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত না হয়, সে জন্য তিনি তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রথমত, দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সরকারকে যুক্তিসংগত ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার সুযোগ নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে যে তারাও দীর্ঘ ১৭ বছর ভুক্তভোগী ছিলেন, তাই তারা যেন নতুন করে অত্যাচারীর ভূমিকায় না যান।বক্তব্যের শেষাংশে মাহমুদুর রহমান বলেন, একসময় তার বিরুদ্ধে ১২৫টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ৬৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে, তবে এখনও প্রায় ৫০টি মামলা চলমান রয়েছে। তার ভাষায়, সরকার চাইলে এসব মামলায় যেকোনো সময় তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে এবং সে জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত