প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬
গুলিতে তিনজন নিহতের পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
২০২৪ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়। ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়ব আহমেদ সিয়াম ও দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী রাসেল আহমদের প্ল্যাকার্ড হাতে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের মাধ্যমে আন্দোলনের শুরু হয়। পরে ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা নেয়ামত উল্লাহ ফারাবীর উদ্যোগে ফেসবুকে ‘কোটা পুনর্বহাল চলবে না, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি গ্রুপ খোলার পর আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়। শুরুতে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে গোপনে ব্যানার, মাইকসহ বিভিন্ন লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হয়।ঈদের ছুটির পর ১ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হয়। ৪ জুলাই শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক অবরোধ করেন। পরদিন ষোলশহরে কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন চট্টগ্রাম শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রাসেল আহমদ, সহ-সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফী এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের বর্তমান সভাপতি আবদুর রহমানসহ বিভিন্ন শিক্ষার্থী নেতৃত্ব দেন। তাদের সঙ্গে ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নেন। এসব কর্মসূচিতে ছাত্রীদেরও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। পাশাপাশি ছাত্রলীগের একটি অংশও আন্দোলনে যুক্ত হয়।১১ জুলাই রেল ও সড়ক অবরোধের পর টাইগারপাসে পুলিশের লাঠিচার্জ এবং ১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই রাতেই চবির জিরো পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগান দিলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। পরদিন সহ-সমন্বয়ক রাফীকে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চাকসুর বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গুরুতর আহত হন। একই দিন বিকেলে ষোলশহর রেলস্টেশনে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। শিক্ষার্থীরা পাথর নিক্ষেপ করে তাদের প্রতিহত করেন।১৬ জুলাই মুরাদপুরে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সরকারি কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এ সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলা ও গুলিতে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ছাত্রশিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং শ্রমিক ফারুক নিহত হন।চট্টগ্রাম ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৬ জুলাই সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হওয়ার পর আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সাধারণ জনগণও আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের কার্যক্রম ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। চবি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী (তৎকালীন অর্থ সম্পাদক) মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। নিরাপত্তার কারণে সমন্বয়ক রাসেল আহমদ ও সহ-সমন্বয়ক রাফী ১৬ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত আত্মগোপনে ছিলেন। পরে তারা আবার আন্দোলনে যুক্ত হন।১৭ জুলাই লালদীঘি ময়দানে নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে। ছাত্রীদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে এবং ছাত্রদের রাত ১০টার মধ্যে আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে থাকা মেস ও কটেজও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।তবে অনেক ছাত্রী হল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। পরে তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক ড. অহিদুল আলম এবং ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক আলী আজগরের নেতৃত্বে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের হল ত্যাগে বাধ্য করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল ছাড়লেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন আবাসিক হলে অবস্থান করেন।১৮ জুলাই সকাল ১০টায় নগরের নতুন ব্রিজ এলাকায় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেন। কর্মসূচিস্থলে কয়েকশ পুলিশ সদস্য এবং রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকারী দল মোতায়েন ছিল। প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী মিছিল শুরু করলে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন।একই দিন বহদ্দারহাট এলাকায় শিক্ষার্থীদের আরেকটি মিছিলে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে চারজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে ২৩ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া মারা যান।১৯ জুলাই লালদীঘি ময়দানে আবারও গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২০ হাজার ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে চবি ছাত্রশিবিরের সাবেক দাওয়া সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শিপন শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে এক দফা ঘোষণা দেন। তবে সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় সে সময় বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়নি।কারফিউ জারির পর ২১ জুলাই সার্জিসক্যাপ হাসপাতালে চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে ছাত্রশিবির নেতা মোহাম্মদ আলীর বৈঠক হয়। সেখানে ২২ জুলাই কারফিউ ভেঙে প্রবর্তক মোড়ে সীমিত পরিসরে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ২৩ থেকে ২৮ জুলাই বড় কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচি না থাকলেও ২৭ জুলাই আবারও গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। লালদীঘি ময়দান, আন্দরকিল্লা, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও নিউমার্কেট এলাকায় নিয়মিত কর্মসূচি চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।২৯ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের কর্মসূচি শেষে চেরাগী পাহাড় মোড়ে নারী শিক্ষার্থীদের স্লোগানে আন্দোলনে নতুন গতি আসে। পরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের নেতাকর্মীদের হামলার সময় আটক শিক্ষার্থীদের রক্ষায় নারী শিক্ষার্থীরা মানবঢাল তৈরি করেন।২ আগস্ট আন্দরকিল্লা থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত মিছিল হয়। ৩ আগস্ট নিউমার্কেট এলাকায় বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। সেখানে সমন্বয়ক রাসেল আহমদ এক দফার পক্ষে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। ৪ আগস্ট একই এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা, গুলিবর্ষণ ও টিয়ারগ্যাসে বহু ছাত্র-জনতা আহত হন।৫ আগস্ট ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচির কারণে চট্টগ্রামে আলাদা কোনো কর্মসূচি ছিল না। তবে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীরা বিজয় মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। পরে তারা বিভিন্ন আবাসিক হলে ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের দাবি করেন।১১ জুলাই পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক ঐক্য’ গঠন করেন। সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান এবং প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান। ৩ আগস্ট নিউমার্কেট এলাকার আন্দোলনেও সংগঠনের কয়েকজন শিক্ষক অংশ নেন।শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আইনজীবীরাও অংশ নেন। ৩১ জুলাই চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করা হয়। এছাড়া জুলাই আন্দোলনে আহত ছাত্র-জনতার চিকিৎসায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, পার্কভিউ হাসপাতাল ও আইএমসি হাসপাতাল প্রায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়।চবি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, আন্দোলনের শুরুতে এটি শিক্ষার্থীদের অধিকারভিত্তিক কর্মসূচি হওয়ায় তারা বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দেন। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩ জুলাই থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পর চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন জেলা শাখার সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। সমন্বয়কদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের বৈঠকেও কর্মসূচির স্থান ও কৌশল নির্ধারণ করা হতো এবং পরে তা সমন্বয়কদের সভায় উপস্থাপন করা হতো।চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, তারা ১০ জুলাই থেকেই নিজ উদ্যোগে আন্দোলনে যুক্ত হন। পরে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ১৪ জুলাই ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৫ ও ১৬ জুলাই মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময়ও তারা সহযোদ্ধাদের সংগঠিত করে আন্দোলন চালিয়ে যান।ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ চবি শাখার সভাপতি আবদুর রহমান বলেন, ৫ জুন কয়েকজন মিলে আন্দোলনের সূচনা করেন। ঈদের ছুটির পর জুলাইয়ের শুরুতে আন্দোলন আবার শুরু হয় এবং পরে তা শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে আন্দোলনের সময় তিনজন নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও জোরদার হয় এবং ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।চবি মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া শিকদার বলেন, নারী শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নারী শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে মানবঢাল হিসেবেও দাঁড়িয়েছিলেন। তবে জুলাই-পরবর্তী সময়ে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্ষণ ও সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এসব ঘটনার কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেন।
সূত্র ও ছবি: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত