প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬
নিরাপত্তা হুমকিতে তড়িঘড়ি বিমান বদলে দেশে ফেরেন ট্রাম্প, প্রকাশ্যে নতুন তথ্য
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
চলতি মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ উড়োজাহাজ পরিবর্তন করেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এবার সেই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ সামনে এসেছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ট্রাম্প এবং তার ব্যবহৃত বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-কে লক্ষ্য করে আকাশপথে হামলার পরিকল্পনা করছিল—এমন নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরই জরুরি ভিত্তিতে বিমান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত সংবেদনশীলতার কারণে তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটো সম্মেলন চলাকালেই এই নির্দিষ্ট হুমকির তথ্য সামনে আসে।ট্রাম্প তুরস্কের আঙ্কারায় পৌঁছেছিলেন কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে। তবে সংবাদমাধ্যমের আগের প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছিল, নতুন এই বিমানটিতে পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থাসহ উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নেই।হুমকির তথ্য পাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিক্রেট সার্ভিস ট্রাম্পকে দ্রুত উড়োজাহাজ পরিবর্তনের জোরালো পরামর্শ দেয়। পরে ট্রাম্প নিজেই জানান, তুরস্ক থেকে ফেরার জন্য তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন।মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানপন্থী প্রক্সি বা ছায়াবাহিনীর লক্ষ্য ছিল কোনো নির্দিষ্ট বিমান নয়; বরং ট্রাম্প যে বিমানেই থাকুন না কেন, সেটিকে আকাশেই ধ্বংস করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা মার্কিন নেতাকে—অর্থাৎ আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চায়। আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় আছি। আজ সকালেও দেখেছি, তাদের প্রতিটি হিটলিস্টে আমার নাম রয়েছে। এত দিন হয়তো আমি কিছুটা ভাগ্যবান ছিলাম, তবে সেই ভাগ্য কত দিন থাকবে, তা বলা যায় না।’তবে শুরুতে বিমান পরিবর্তনের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, ব্রিটেনে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যদের নতুন উড়োজাহাজটি দেখার সুযোগ করে দিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণও তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। কিন্তু পরবর্তীতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শ ও চাপের কারণেই তিনি বিমান বদল করেন।হামলার আশঙ্কা সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্যটি মার্কিন প্রশাসনের খুব সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তার মধ্যে রাখা হয়েছিল। অনেক কর্মকর্তাকে শুধু ‘ইরানসংক্রান্ত সাধারণ নিরাপত্তা উদ্বেগ’-এর কথা জানিয়ে বিমান পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি অবহিত করা হয়। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের শীর্ষ সদস্যদেরও এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়নি। হোয়াইট হাউসও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ট্রাম্পকে হত্যার বিষয়ে ইরানের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার কথা স্বীকার করে প্রেসিডেন্ট ও তার সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন।এ সময় আরেকটি গোয়েন্দা তথ্য নিয়েও আলোচনা চলছিল। ইসরায়েল ট্রাম্পকে হত্যার বিষয়ে ইরানের তৎপরতা সম্পর্কিত নির্দিষ্ট তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। তবে মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ওই তথ্যকে কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখেন। তাদের ধারণা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করতেই ইসরায়েল এ তথ্য দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, তুরস্কে বিমান পরিবর্তনের পেছনে যে গোয়েন্দা তথ্য কাজ করেছে, সেটি ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। উল্লেখ্য, ট্রাম্প আঙ্কারায় অবস্থানকালে, যা তেহরান থেকে প্রায় এক হাজার মাইল দূরে, তখনই ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বিমান হামলা শুরু করে।কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমানের নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের আগের প্রতিবেদন প্রকাশের পর মার্কিন সরকার তথ্য ফাঁসের তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমটির কয়েকজন সাংবাদিকের গ্র্যান্ড জুরি সাক্ষ্য গ্রহণ এবং তাদের ও তাদের স্বজনদের ফোন রেকর্ড চেয়ে আইনি নোটিশ জারি করা হয়। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বৃহস্পতিবার মার্কিন বিচার বিভাগ সেই নোটিশ প্রত্যাহার করে নেয়।গত রোববার ট্রাম্পও পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন, কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজে এখনো পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের সব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি যুক্ত হয়নি। এক সাংবাদিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করলে ট্রাম্প বলেন, খুব শিগগিরই বিমানটিকে সর্বোচ্চ আধুনিক মানে উন্নীত করা হবে।হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, অতিরিক্ত নিরাপত্তা আধুনিকায়নের জন্য আগামী শরতে প্রায় এক মাসের জন্য নতুন বিমানটি সাময়িকভাবে সেবার বাইরে থাকবে। ওই সময়ে ট্রাম্প তার পুরোনো বিমান ব্যবহার করবেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যে কী ধরনের প্রযুক্তি সংযোজন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে সিক্রেট সার্ভিসের উদ্বেগও বেড়েছে। গত বুধবার ‘হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনার’-এর আগে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির পরিচালক শন কারান বলেন, তাদের সুরক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের প্রতি বর্তমান হুমকির মাত্রা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে গত এপ্রিলে একজন বন্দুকধারী নিরাপত্তাচৌকি অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করায় একই অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছিল। শন কারান ট্রাম্পের দুই মেয়াদের মধ্যবর্তী সময়ে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলের নেতৃত্বে ছিলেন এবং ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে ট্রাম্প গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময়ও তার পাশে ছিলেন।মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, ইরান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পকে হত্যার সুযোগ খুঁজছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের প্রভাবশালী কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যার ঘটনা।ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ১৯৯০ সাল থেকে ব্যবহৃত পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমান দুটির অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। গত বছর কাতার তাকে একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ উপহার দেয়। প্রায় ১৪ বছর পুরোনো ওই বিমানকে দ্রুত এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা হলেও পুরোনো বিমানের সমমানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতে সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার মেয়াদ শেষ হলে বিমানটি প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরির অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: ইত্তেফাক/এনএন
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত