প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি আন্দোলনের প্রভাব, পাকিস্তানের জন্য সতর্কবার্তা বিশ্লেষকদের
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় দ্রুত পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার, প্রশ্নফাঁসের বিচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাসহ নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ক্ষোভ অনেক ক্ষেত্রে একদলীয় শাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পর এ প্রভাব ভারতের রাজনীতিতেও দৃশ্যমান হয়েছে।পাকিস্তানের খ্যাতনামা লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ হোসেন দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার এই পরিবর্তন পাকিস্তানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। তার মতে, সময়মতো সুশাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে প্রায় ৭ কোটি জেন-জি জনগোষ্ঠী নিয়ে দেশটি বড় ধরনের ‘জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ের’ মুখোমুখি হতে পারে।ভারতে প্রশ্নফাঁস এবং এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার বিচার দাবিতে তরুণরা নয়া দিল্লির রাজপথে আন্দোলনে নামে। অল্প সময়ের মধ্যে সেই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে এটিকে শাসকদলের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার পরিণতিতে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন।তরুণদের অবমূল্যায়ন করে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে নতুন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি অধিকার আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। মূলধারার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের বাইরে আন্দোলন সংগঠিত করতে তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও তরুণদের আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন শেখ হাসিনা সরকারের একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকারের দমনপীড়ন ও শত শত প্রাণহানির পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এবং দেশে অবাধ নির্বাচনের পথ সুগম হয়।নেপালে সমালোচনামূলক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের ওপর নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দুর্নীতি ও বেকারত্বে ক্ষুব্ধ তরুণরা রাজপথে নামেন এবং সংঘর্ষের একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর এক তরুণ নেতার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের আলোচিত ‘আরাগালয়া’ (সংগ্রাম) আন্দোলন দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক কুশাসন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং পারিবারিক শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল। এই আন্দোলনের ফলেই রাজাপাকসে রাজবংশ ক্ষমতাচ্যুত হয়।পাকিস্তানের জন্য কী শিক্ষা?পাকিস্তানে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া জেন-জি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। এই বিশাল যুবসমাজকে জনসংখ্যাগত বোনাসে রূপান্তরের সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।খাইবার পাখতুনখাওয়া, বেলুচিস্তান ও আজাদ কাশ্মীরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং রাজপথের আন্দোলনকে যদি পাকিস্তান সরকার শুধু সেন্সরশিপ বা দমনপীড়নের মাধ্যমে মোকাবিলার চেষ্টা করে, তবে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।বিশ্লেষক জাহিদ হোসেনের মতে, ডিজিটাল যুগে মূলধারার বা তথাকথিত ‘ল্যাপডগ’ মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা ইন্টারনেট বন্ধ করে তরুণদের কণ্ঠরোধ করা সম্ভব নয়। তার ভাষ্য, দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—তরুণদের গণতান্ত্রিক অধিকার উপেক্ষা করা হলে সেই ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিত্তিকেও নড়িয়ে দিতে সক্ষম।
সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত