প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
মানবপাচার চক্রের পেটে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মুজাহিদপুর গ্রামের বাসিন্দা কামরুজ্জামান। ২০২৪ সালে তাঁকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে একটি মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ফাঁদে ফেলে।পরবর্তীতে তাঁকে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে জিম্মি করে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে আরও ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয় ২৫ লাখ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতালিতে পৌঁছানো হয়নি তাঁর।একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ইমরান হোসেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাচারকারী চক্র প্রথমে তাঁকে বিমানে কুয়েতে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে মিসর হয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।প্রথমে তিনি দেশের মানবপাচারকারী চক্রকে পাঁচ লাখ টাকা দেন। এরপর লিবিয়ায় নিয়ে তাঁকে জিম্মি করে ড্রিল মেশিন দিয়ে পা ফুটো করার মতো নির্যাতনের মাধ্যমে আরও ১৯ লাখ টাকা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয় ২৪ লাখ টাকা। প্রায় এক বছর জিম্মি অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সহযোগিতায় গত বছর দেশে ফেরেন তিনি।কামরুজ্জামান ও ইমরানের মতো হাজারো যুবক পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার যুবককে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। ইতালিতে পাঠানোর জন্য জনপ্রতি ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি করা হলেও লিবিয়ায় নেওয়ার পর অনেককে জিম্মি করে আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়। এভাবে মানবপাচারকারী চক্র বছরে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।এই অর্থের বড় একটি অংশ দেশের বাইরে অবস্থানরত পাচারকারী চক্রের সদস্যদের কাছে চলে যায়। সম্প্রতি ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জার্মানির ‘রবার্ট বোশ স্টিফটুং’ ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় ‘মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার (এমএমসি)’ একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আরেজো মালাকুটির নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় লিবিয়া হয়ে বাংলাদেশিদের ইতালি যাওয়ার পেছনে বিপুল অর্থ লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে।প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে সমুদ্রপথে প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশি ইতালিতে পৌঁছেছেন। পাচারকারী চক্রের আদায়কৃত অর্থ বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, তারা সরাসরি অন্তত ১৬০ থেকে ১৯০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা নিজেদের দখলে নিয়েছে। বাকি অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ের দালাল, ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরি এবং ট্রানজিট রুটের বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখিয়ে আদায় করা হয়েছে।মানবপাচার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় যান। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে ইতালিতে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও অনেকেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন অথবা লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় আটকে থাকেন।তার বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে। গত ৭ জুলাই লিবিয়ার বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার এবং ত্রিপোলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে আটক থাকা ১৭৪ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, লিবিয়া সরকার এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সহযোগিতায় তাঁদের প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়।এমএমসির তথ্য অনুযায়ী, মানবপাচারকারী চক্র বর্তমানে আগের তুলনায় আরও সংগঠিত। স্থানীয় চায়ের দোকান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে তারা সম্ভাব্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহারও বাড়িয়েছে তারা। ইমো ও ফেসবুকের মাধ্যমে ইতালি পাঠানোর প্রচারণা চালানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ইতালিতে পৌঁছেছেন—এমন ব্যক্তিদের সাজানো ভিডিও বা ভুয়া সফলতার গল্প দেখিয়ে যুবকদের আকৃষ্ট করা হয়। অর্থ লেনদেন ও যাত্রার বিভিন্ন আপডেটও এসব অ্যাপের মাধ্যমে দেওয়া হয়।অনেক ক্ষেত্রে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও মানবপাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য বৈধ প্রক্রিয়া ও পাচারকারীদের প্রতারণার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে।বিদেশ যেতে আগ্রহীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ‘প্যাকেজ’ও দেওয়া হয়। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজের মূল্য ১০ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ টাকা। এ অর্থ দুই ধাপে নেওয়া হয়—বাংলাদেশে তিন হাজার ডলার এবং লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সাত হাজার ডলার। অন্যদিকে অল-ইনক্লুসিভ প্যাকেজের মূল্য ১৪ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৭ লাখ টাকা। এই প্যাকেজে লিবিয়া থেকে ইতালি পর্যন্ত সব ঝুঁকি নেওয়ার দাবি করা হলেও বাস্তবে অনেককে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর জিম্মি করা হয়। এরপর ‘সিকিউরিটি ফি’, ‘কোস্টাল ক্লিয়ারেন্স’ কিংবা উন্নত নৌকায় পারাপারের অজুহাতে আরও ১৫ থেকে ১৭ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারলে তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।সূত্র জানায়, ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়ে যাওয়া যুবকদের মাত্র ৩০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। বাকি ৭০ শতাংশ হয় ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারান, নয়তো লিবিয়ার গোপন বন্দিশালায়, যেমন মিজদা বা অন্য স্থানে, জিম্মি অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটান। অনেকে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসে ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হন।এমএমসির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের জন্য কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে মানবপাচার করা হয় সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, ফেসবুক ও ইমোর মাধ্যমে পাচারের বিজ্ঞাপনদাতাদের শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে সক্রিয় করা, বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে সক্রিয় সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং লিবিয়া-ইতালি রুটের ঝুঁকি সম্পর্কে ইউনিয়ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অধিকাংশ অভিবাসী বৈধ পাসপোর্ট ও ভিজিট ভিসা নিয়ে ঢাকা ছাড়েন। বিমানবন্দরে পাচারকারী চক্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে। নির্দিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে আগে থেকেই ‘ম্যানেজ’ করে বিশেষ ‘কোড’ ব্যবহারের মাধ্যমে অভিবাসীদের পার করে দেওয়া হয়। অনেক সময় অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিএমইটি স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করে যাত্রাকে বৈধ শ্রমিকের মতো দেখানো হয়।এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরাসরি লিবিয়ায় যাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় পাচারকারীরা দুবাই, মিসর, তুরস্ক কিংবা শ্রীলঙ্কাকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে। অনেককে কুয়েত বা মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলা হলেও মাঝপথে তাঁদের পাসপোর্ট নিয়ে জোরপূর্বক লিবিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, মানবপাচার প্রতিরোধে সরকার কাজ করছে। অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে নতুন আইন করা হয়েছে এবং বর্তমানে সেই আইনের বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। তিনি আরও বলেন, ইতালিমুখী মানবপাচারের ঘটনা ইতোমধ্যে কিছুটা কমেছে এবং তা আরও কমাতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত