প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
বিদেশে কোটি টাকার চাহিদা, দেশে নেই ক্রেতা বন্ধ হওয়ার পথে সাপের বিষের খামার
সম্পাদক ইনসাফ টাইমস ২৪ ||
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিষধর সাপের কামড়ে বহু মানুষের মৃত্যু ও অসুস্থতার ঘটনা ঘটে। অথচ সাপের বিষের প্রতিষেধক (অ্যান্টিভেনম) তৈরির জন্য এখনও বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। এই নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে পটুয়াখালীতে গড়ে ওঠে দেশের প্রথম বেসরকারি সাপের খামার ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’। তবে দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে অনুমোদন পেলেও উৎপাদিত কাঁচা বিষ বিক্রির কোনো সুযোগ না থাকায় বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগ।প্রবাস জীবন ছেড়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগপটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নদীপাড়া গ্রামে খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রবাসীফেরত উদ্যোক্তা আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস। সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করার সময় তিনি উপলব্ধি করেন, দেশে ফিরে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যা একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।তিনি জানান, সেই ভাবনা থেকেই দেশে ফিরে সাপের খামার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ৩০০টিরও বেশি বিষধর ও নির্বিষ সাপ রয়েছে। এর মধ্যে কিং কোবরা, গোখরা, শঙ্খিনী, কালনাগ, রাসেলস ভাইপার, পিট ভাইপার, অজগর ও দাঁড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ রয়েছে। প্রশিক্ষিত কর্মীরা নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করে এসব সাপের পরিচর্যা ও বিষ সংগ্রহের কাজ করেন।অনুমোদন পেতে লেগেছে এক যুগেরও বেশি সময়আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, ২০০৮ সালে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে খামারের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে প্রায় এক দশক পর ২০১৮ সালে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধনের অনুমোদন পান। এর মাধ্যমে আইনগতভাবে সাপের বিষ সংগ্রহের পথ উন্মুক্ত হয়।উৎপাদন আছে, নেই ক্রেতাঅনুমোদন পেলেও উৎপাদিত কাঁচা বিষ বিক্রি করতে না পারায় এখন চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন উদ্যোক্তা। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কাঁচা বিষ কিনতে আগ্রহ দেখায়নি। কারণ, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কাঁচা বিষ সরাসরি ব্যবহার করা যায় না; এটি পরিশোধন (রিফাইনিং) করে অ্যান্টিভেনমসহ বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করতে হয়।খামারির দাবি, দেশে এখনো বিষ পরিশোধনের অনুমোদনপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় উৎপাদিত বিষ বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিষ সংগ্রহের সক্ষমতা থাকলেও তা অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।বছরে কোটি টাকার সম্ভাবনাখামার কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। এই বিষ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা।অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইএকসময় এই খামারে ৮৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করলেও বর্তমানে আর্থিক সংকটের কারণে সেই সংখ্যা কমে মাত্র চারজনে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকা পরিচালন ব্যয় হলেও আয় না থাকায় খামারটি টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস।যা বলছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরপটুয়াখালীর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খামারটি সাপের বিষ সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছে। তবে উৎপাদিত বিষ সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বিষ পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ব্যবহার বা বিক্রির সুযোগ রয়েছে। খামার কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে পরবর্তী ধাপের অনুমোদনের জন্য আবেদন করলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সার্বিক সহযোগিতা করবে বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এই উদ্যোগ শুধু একটি খামার নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যখাত, গবেষণা, ওষুধশিল্প এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত