প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬
বকশীগঞ্জে দশানী নদীর ভয়াল ভাঙন: ঘরবাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসা ও কবরস্থান বিলীন, চরম দুর্ভোগে শত শত পরিবার
আবু তাহের। ||
বকশীগঞ্জে দশানী নদীর ভয়াল ভাঙন: ঘরবাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসা ও কবরস্থান বিলীন, চরম দুর্ভোগে শত শত পরিবারআবু তাহের , বকশীগঞ্জ (জামালপুর)জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ও নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দশানী নদীর তীব্র ভাঙনে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। নদীর করাল গ্রাসে প্রতিদিনই বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, মসজিদ, মাদ্রাসা, পুরাতন কবরস্থানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে শত শত পরিবার তাদের সহায়-সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাগিরপাড়া, ফকিরপাড়া, আবুলপাড়া, ভাটি কলকিহারা, বেতমারী, নিলক্ষিয়া, সাজিমারা, নয়াপাড়াসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রতিদিনই নদীর পাড় ধসে নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। অনেক পরিবার শেষ সম্বল রক্ষায় ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। আবার অনেকেই তা করতে না পেরে চোখের সামনেই বসতভিটা নদীতে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।স্থানীয়দের দাবি, চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকেই ভাঙনের তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে অসংখ্য বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। কৃষকের আবাদি জমি, ফলজ ও বনজ গাছপালা নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অনেক পরিবার জীবিকার সংকটে পড়েছে। অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।জাগিরপাড়া গ্রামের মোঃ নবাব আলী (৭৫), পিতা-মৃত কলিমউদ্দিন বলেন, "সারা জীবনের কষ্টের অর্জন ছিল আমার বসতভিটা। নদী সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে, এখন মাথা গোঁজারও জায়গা নেই। এই বয়সে কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। সরকার যেন দ্রুত আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে।"স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদোস বলেন, "প্রতিদিন নদী ভাঙছে। আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি। কখন ঘরটা নদীতে চলে যাবে সেই ভয় নিয়ে দিন কাটছে। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকাই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।"আরেক বাসিন্দা দুদু (জাগিরপাড়া) বলেন, "আমাদের জমি, ঘরবাড়ি, গাছপালা সব নদীতে চলে যাচ্ছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি জানাই।"স্থানীয়রা জানান, নদীভাঙনের কারণে শুধু বসতবাড়িই নয়, মসজিদ, মাদ্রাসা, পুরাতন কবরস্থান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় স্থাপনাও হুমকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের গতি অব্যাহত থাকলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।এ বিষয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, "নদীভাঙনকবলিত এলাকার পরিস্থিতি উপজেলা প্রশাসনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। যেসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ প্রয়োজন, সেখানে ভাঙন প্রতিরোধের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এলাকাগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ ও অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে বাকি এলাকাগুলোতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নকিবুজ্জামান খান মুঠোফোনের মাধ্যমে বলেন, "বকশীগঞ্জ উপজেলার ভাটি কলকিহারা, বাঙ্গালপাড়া ও ঘুঘুরাকান্দি এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধে কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া নতুন করে বেতমারী গ্রামকে ভাঙনকবলিত এলাকা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। জাগিরপাড়াসহ আশপাশের ভাঙনকবলিত এলাকার পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"এদিকে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী দ্রুত নদীশাসনের স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং জরুরি আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অল্প সময়ের মধ্যেই আরও অসংখ্য পরিবার বসতভিটা হারিয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়বে।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত