প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
২০২৪ সালের ১ আগস্ট (৩২ জুলাই) ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) হেফাজতে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ছয় ছাত্রনেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়। সেদিন দুপুর দেড়টার দিকে কালো রঙের দুটি গাড়িতে করে তাদের নিজ নিজ বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।মুক্তি পাওয়া ছাত্রনেতাদের মধ্যে কেউ ছয় দিন, কেউ পাঁচ দিন এবং কেউ চার দিন ডিবি হেফাজতে ছিলেন। টানা ৩২ ঘণ্টা অনশনের পর মুক্তি পেয়ে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। একই দিনে সরকারের নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের বাবা বদরুল ইসলাম জানান, ১ আগস্ট ভোর ৬টার দিকে পরিবারের সদস্যদের ফোন করে ডিবি কার্যালয়ে যেতে বলা হয়। পরে দুপুর দেড়টার দিকে ডিবির গাড়িতে করে তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।তিনি আরও বলেন, নাহিদসহ অন্যরা ডিবি কার্যালয়ে দুই দিন অনশন করেন এবং বর্তমানে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল। নুসরাত তাবাসসুমকে আলাদাভাবে রাখা হয়েছিল এবং তিনিও ৩২ ঘণ্টা অনশনে ছিলেন।মুক্তির পর সারজিস আলম ছয় সমন্বয়কের পক্ষে ফেসবুকে লেখেন, “ছয়দিন ডিবি হেফাজতে আটকে রাখা যায়, কিন্তু বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আটকানো সম্ভব নয়। যতদিন জুলুম চলবে, ততদিন আন্দোলন চলবে।” ওই স্ট্যাটাস দেওয়ার কিছু সময় পর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট অকার্যকর হয়ে যায়।এর আগে প্রথম দফায় ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁও থেকে নাহিদ ইসলামকে তুলে নেওয়া হয়। একদিন পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পূর্বাচলে ফেলে রাখা হয়। একইভাবে আসিফ ও বাকেরকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পাঁচ দিন পর চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। পরে তারা গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর তাদের আবারও ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের স্মরণে ১ আগস্ট সারা দেশে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিবাদী স্লোগান, গণসংগীত, পথনাটক, দেয়াল লিখন ও চিত্রাঙ্কনের আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আইনজীবী ও অভিভাবকরা অংশ নেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং অন্তত ১৬টি জেলা ও মহানগরে কর্মসূচি পালিত হয়।তবে বিভিন্ন স্থানে এসব কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার অভিযোগ ওঠে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। কয়েকটি স্থান থেকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মিছিল করেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ৯ দফা দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিল বের করেন।অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামীপন্থি নীল দল। লিখিত বক্তব্যে তারা দাবি করে, শিক্ষার্থীদের দাবির কাঙ্ক্ষিত সমাধান হয়েছে এবং আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানায়।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যান। এছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালিত হয়। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায়ও পুলিশের বাধা এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।অনেক স্থানে বৃষ্টির মধ্যেও শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রাণহানি, হামলা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা বিক্ষোভ করেন। তারা শিক্ষার্থী হত্যার বিচার দাবি করেন এবং একই সঙ্গে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান জানান।নতুন কর্মসূচি ঘোষণাকোটা সংস্কার আন্দোলনে হতাহত ছাত্র-জনতার স্মরণে ২ আগস্ট দেশব্যাপী ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গণহত্যা ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদ এবং ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ২ আগস্ট জুমার নামাজের পর দোয়া, শহীদদের কবর জিয়ারত, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে প্রার্থনা এবং ছাত্র-জনতার গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে শ্রমিক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, বুদ্ধিজীবী, আলেম-ওলামাসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।৭৮ শতাংশ শহীদের শরীরে প্রাণঘাতী ক্ষততৎকালীন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ১ আগস্ট পর্যন্ত কোটা আন্দোলনের সহিংসতায় ২১২ জন শহীদ হন। তাদের মধ্যে ১৩৭ জনের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রায় ছয় হাজার ৭০০ আহতের মধ্যে ২৩১ জন গুলিবিদ্ধ ছিলেন। অনেকের চোখে ছররা গুলি লাগে এবং কয়েকজনের পা কেটে ফেলতে হয়। তবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে জানায়, বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। সহিংসতা ও গুলির ঘটনায় উদ্বেগ জানায় জাতিসংঘও। সংস্থাটির মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, বাংলাদেশে গুলির দৃশ্য নিন্দনীয় এবং সরকারের উচিত জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জানায়, সরকার অন্যায় করছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে।প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চান শেখ হাসিনা১ আগস্ট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। প্রয়োজনে জাতিসংঘ বা অন্য দেশের বিশেষজ্ঞদেরও তদন্তে যুক্ত করা যেতে পারে। তিনি সহিংসতার জন্য জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে দায়ী করে বলেন, তারা কোটা আন্দোলনের আড়ালে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছে।তিনি আরও বলেন, যারা দেশের উন্নয়ন চায় না, তারাই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গাজা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থী দমনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার সেই পথ অনুসরণ করছে না।শেখ হাসিনার আহ্বানের পর জাতিসংঘ জানায়, কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ চাইলে তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এ তথ্য জানান। এদিকে ১৬ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানি, সহিংসতা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা তদন্তে হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে।জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ১ আগস্ট বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮(১) ধারা অনুযায়ী নির্বাহী আদেশ জারি করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ আদেশ অনুযায়ী জামায়াত-শিবির এবং তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না।তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোটা আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতায় জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপরাধের প্রমাণের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সহিংসতার সংশ্লিষ্ট তথ্যও সরকারের হাতে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নতুনভাবে দলগত রাজনীতি করার চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
সূত্র: আমার দেশ