প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
এবার লিবিয়ার তেলের দিকে ট্রাম্পের নজর
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান পরিচালনার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে কারাবন্দি করেন। এরপর দেশটির জ্বালানি তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যায়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে। তবে এই অর্থ কোথায় বা কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টি এখন লিবিয়ার তেলের দিকে। নিজের প্রতিনিধি এবং বেয়াই (মেয়ে টিফানির শ্বশুর) মাসাদ বুলোসের মাধ্যমে লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষমতাসীন দুই সরকারসহ তিনটি রাজনৈতিক পক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তুলে দেশটির তেলসম্পদের ওপর মার্কিন ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।লিবিয়া নিয়ে ট্রাম্পের নতুন আগ্রহের প্রধান কারণ দেশটির বিশাল জ্বালানি তেলসম্পদ। এতদিন দেশটির ঘটনাপ্রবাহে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা সীমিত থাকলেও এখন নতুন করে সক্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে একটি অর্থনৈতিক হিসাব। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে লিবিয়ার দৈনিক তেল উৎপাদন দ্বিগুণ করে ৩০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা গেলে কনোকোফিলিপস ও শেভরনের মতো মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো লাভবান হবে। এসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই লিবিয়ার তেল নিয়ে চুক্তি করেছে।এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১৮ জুন লিবিয়ার তিনটি প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। ওই চুক্তিতে ২০২৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির আগেই প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়। সংঘাতে জর্জরিত লিবিয়ায় গত ১৮ বছরের মধ্যে এটিই এ ধরনের প্রথম সমঝোতা। চুক্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে গত এপ্রিল মাসে গৃহীত ৩০ বিলিয়ন ডলারের একীভূত রাষ্ট্রীয় বাজেট, যা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রণীত প্রথম একীভূত বাজেট।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকাবিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা এবং টিফানি ট্রাম্পের শ্বশুর মাসাদ বুলোস এই সমঝোতা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইতালির রোমে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পর থেকেই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন তিনি।তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সাধারণ লিবিয়ানদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, রোমের ওই বৈঠকে দেশটির সুশীল সমাজ, উপজাতীয় গোষ্ঠী, বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনী, নারী ও তরুণদের কোনো প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।মাসাদ বুলোস পেশায় কূটনীতিক নন; তিনি একজন লেবানিজ-আমেরিকান ব্যবসায়ী। লিবিয়ার জনগণের একাংশের মতে, তার প্রধান পরিচয় তিনি টিফানি ট্রাম্পের শ্বশুর। তাদের মতে, লিবিয়া নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে দেশটির তেল। এতে ন্যাটোর লিবিয়া হস্তক্ষেপের সময় ট্রাম্পের সেই পুরোনো বক্তব্যের কথাও সামনে আসে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিনিময়ে লিবিয়ার তেল বিক্রির আয়ের অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রের পাওয়া উচিত।আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে প্রমাণিত তেলের সবচেয়ে বড় মজুত রয়েছে লিবিয়ায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংঘাত ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এই সম্পদ জাতীয় স্বার্থে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। দেশটির জাতীয় তেল কোম্পানি ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনকে একীভূত করে দলীয় ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত রাখা গেলে দৈনিক তেল উৎপাদন ১৫ লাখ ব্যারেলের বেশি হতে পারে। এতে রাষ্ট্রের আয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।বর্তমানে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে জেনারেল খলিফা হাফতারের সমর্থিত সরকার এবং পশ্চিমাঞ্চলে ত্রিপোলিভিত্তিক জাতিসংঘ সমর্থিত গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি (জিএনইউ) ক্ষমতায় থাকায় তেলসম্পদ নিয়ে বিভাজন ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।জিএনইউয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ ইজ্জেদিন দ্য নিউ আরবকে বলেন, দুটি সরকার একীভূত হলে সরকারি ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসবে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। অপর বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-ফিতোরি বলেন, লিবিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে প্রতিটি শহর যেন আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তার মতে, একটি ঐক্যবদ্ধ সাংবিধানিক কাঠামোই জাতীয় নির্বাচনের একমাত্র পথ, যার মাধ্যমে বৈধ ও স্থায়ী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।একীভূত বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার জাতীয় স্বার্থে সমঝোতায় রাজি হয়েছিল। পাশাপাশি লিবিয়ার সিরতে শহরে আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক কমান্ডের সঙ্গে অনুষ্ঠিত 'ফ্লিন্টলক ২০২৬' মহড়ায় উভয় পক্ষের বাহিনী প্রথমবারের মতো একই কমান্ডের অধীনে অংশ নেয়। তবে মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে নতুন চুক্তির কাঠামো নিয়েই।বুলোসের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রোমে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে খলিফা হাফতারের ছেলে ও বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার সাদ্দাম হাফতার এবং জিএনইউ প্রধান আব্দুল হামিদ দবেইবেহর ভাতিজা ও উপদেষ্টা ইব্রাহিম দবেইবেহ প্রথমবারের মতো মুখোমুখি আলোচনায় বসেন। সেখানে সাদ্দাম হাফতারের নেতৃত্বে নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল গঠন, দবেইবেহর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ সরকার প্রতিষ্ঠা এবং দুই পরিবারের মধ্যে ভৌগোলিক ভিত্তিতে সামরিক কমান্ড ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।মূলত ক্ষমতাধর পক্ষগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতার ভিত্তিতেই এই উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে এটি বাস্তবায়িত হলেও লিবিয়ার দীর্ঘদিনের মৌলিক সংকটের সমাধান হবে না বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। লিবীয় বিশ্লেষক আব্দুলসালাম আল-রাজহির মতে, এই চুক্তি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নয়, বরং কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে।ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সমঝোতা ও লিবিয়ার তেলজাতিসংঘ-সমর্থিত পুনর্মিলন ও মানবাধিকারবিষয়ক 'স্ট্রাকচার্ড ডায়ালগ' প্রক্রিয়ার সদস্য হানিন বুশুশে বলেন, নির্বাহী ক্ষমতা একীভূত করার যেকোনো উদ্যোগকে কেবল ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সমঝোতা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; বরং সাধারণ লিবিয়ানদের ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।তিনি দ্য নিউ আরবকে বলেন, একত্রীকরণ তখনই অর্থবহ হবে যখন তা বৈধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হবে। সংকটের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত রেখে শুধু নাম পরিবর্তন বা পদ পুনর্বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না।সমালোচকদের মতে, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার বাইরে রাজনৈতিক সমঝোতা হলে তা আন্তর্জাতিক উদ্যোগের বৈধতাকে দুর্বল করবে। তাদের ভাষ্য, নতুন এই চুক্তিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের পরিবর্তে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলোর দরকষাকষিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।রাশিয়া নতুন এই চুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখছে এবং 'বুলোস উদ্যোগ'কে বার্লিন প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া বারবার বলছে, লিবিয়ার যেকোনো সমাধানে দেশটির নিজস্ব মালিকানা ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।এরপর কী হতে পারে১৮ জুনের এই সমঝোতাকে গত কয়েক বছরে লিবিয়ার ঐক্যের পথে সবচেয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সমন্বিত বাজেট গৃহীত হয়েছে, যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং নির্বাচন আয়োজনের রূপরেখাও প্রস্তুত রয়েছে।তবে এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না, তা নির্ভর করবে এটি শুধু হাফতার ও দবেইবেহ পরিবারের মধ্যকার সমঝোতা হয়ে থাকবে, নাকি সাধারণ লিবিয়ানরাও এটিকে নিজেদের উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করবে—তার ওপর। ২০১১ সালে পশ্চিমাদের সহায়তায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির ক্ষমতাচ্যুতি ও মৃত্যুর পর থেকে লিবিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।বিশ্লেষকদের মতে, লিবিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো বিবেচনায় না এনে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের তেলবাণিজ্যিক স্বার্থকে সামনে রেখে তিন পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গাজা, লেবানন ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের প্রতিফলন। এসব ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন সাফল্যের ঘোষণা দেওয়ার পর প্রাথমিক চুক্তিগুলো টেকেনি। লিবিয়াতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশটির বিভিন্ন মহল বলছে, কয়েকটি পরিবারের মধ্যে হওয়া সমঝোতাকে লিবিয়ার জনগণের চুক্তি হিসেবে দেখা যায় না।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত