প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ আগস্ট ২০২৬
পে স্কেল বাস্তবায়নে আইএমএফের আপত্তি, তবুও এগোচ্ছে সরকারের প্রস্তুতি
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট শিগগিরই প্রকাশ হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার ভাষ্য, নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলেই গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হবে।তবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক সক্ষমতা। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অন্তত দুই বছর পে স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার পরামর্শ দিলেও সরকার সেই পরামর্শ গ্রহণ করেনি। বরং অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগেই গেজেট প্রকাশ করে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।এক যুগেও আসেনি নতুন পে স্কেলসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন কোনো পে স্কেল ঘোষণা করা হয়নি।এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন পে স্কেলের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম জাতীয় পে কমিশন সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২১ এপ্রিল পৃথক একটি কমিটি গঠন করে পুরো পে স্কেল পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেয়। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।অতীতের পে স্কেলগুলোর চিত্রস্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আটটি জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয়েছে। প্রতিটি পে স্কেলেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বিভিন্ন হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।১৯৭৩ সালের প্রথম পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা। ১৯৭৭ সালের দ্বিতীয় পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৭৩ শতাংশ বেড়ে ২২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত হয়।১৯৮৫ সালের তৃতীয় পে স্কেলে সবচেয়ে বড় বেতন বৃদ্ধি হয়। সে সময় সর্বনিম্ন মূল বেতন ১২২ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন দ্বিগুণ হয়ে ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।১৯৯১ সালের চতুর্থ পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার টাকা হয়।১৯৯৭ সালের পঞ্চম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।২০০৫ সালের ষষ্ঠ পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৬০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫৩ শতাংশ বেড়ে ২৩ হাজার টাকায় পৌঁছায়।২০০৯ সালের সপ্তম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা।সর্বশেষ ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১০১ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।বাস্তবায়নে আর্থিক চাপঅর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের আওতায় প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী অন্তর্ভুক্ত হবেন। মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা এবং পেনশন বাবদ ব্যয়ও বাড়বে।অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় অন্তত ৮২ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা প্রয়োজন হবে।আইএমএফের পরামর্শ ও সরকারের অবস্থানঅর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে—এ আশঙ্কা থেকেই আইএমএফ অন্তত দুই বছর পে স্কেল বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এতে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে।তবে সরকার এ পরামর্শ গ্রহণ করেনি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব, বাজেট সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত বহাল রেখে প্রয়োজনে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেন।অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে আইএমএফের ঋণের কোনো সম্পর্ক নেই। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রজ্ঞাপন জারি করতে বেশি সময় লাগবে না।শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে প্রস্তাবসবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। অনুমোদন মিললে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার পথ উন্মুক্ত হবে।তবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আয়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত