প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬
৩৬টি রাবার বুলেট খেয়েছি, হারিয়েছি একটি হাত’
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় আমি পড়াশোনা করতাম না। এর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখন চিত্রনায়ক রাজ্জাকের মার্কেট রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সে চাকরি করতাম। তবে আবার পড়াশোনা শুরু করার ইচ্ছা রয়েছে। এখন যেহেতু রাজনীতি করার ইচ্ছা আছে, তাই পড়াশোনাও প্রয়োজন বলে মনে করি। সে কারণেই আবার লেখাপড়ায় ফিরতে চাই।আমি প্রথম আন্দোলনে অংশ নিই ১৪ জুলাই। সেদিন প্রায় দুই ঘণ্টা আন্দোলনে ছিলাম। পরে মার্কেট খোলা থাকায় আর থাকতে পারিনি। ১৮ জুলাই থেকে পুরোপুরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হই, কারণ ওই দিন থেকে মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর পর বিষয়টি সবার বিবেককে নাড়া দেয়। আমি যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতাম, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকেই তাদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকতাম। তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেই আন্দোলনে যোগ দিই।১৮ জুলাই থেকেই দমন-পীড়নের মুখে পড়ি। ওই দিন ৩৬টি রাবার বুলেটে আহত হই। এরপর ২৩ জুলাই, ২৭ জুলাই, ৩ আগস্ট এবং সর্বশেষ ৫ আগস্টও গুলিবিদ্ধ হই।৫ আগস্ট খুনি হাসিনার দেশত্যাগের খবর পাওয়ার পর আমরা পুলিশ সদস্যদের বলেছিলাম, ‘আপনারা গুলি চালাবেন না। যার নেতৃত্বে আপনারা গুলি চালিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যে পালিয়ে গেছেন। জনগণের বিরুদ্ধে লড়াই করে আপনারা টিকতে পারবেন না। গুলি বন্ধ করুন, আমরা আপনাদের সঙ্গে সংঘাতে যাব না।’ কিন্তু তারা গুলি থামায়নি। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই, তারা যদি গুলি বন্ধ না করে, তাহলে আমরাও আমাদের অবস্থান থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাব।বিকেল চারটার দিকে আমি গুলিবিদ্ধ হই। পরে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার চেষ্টা করেও সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় ৬ আগস্ট রাত ১২টার পর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আমার ডান হাত কেটে ফেলতে হয়।জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা আমি ৫ আগস্ট প্রত্যক্ষ করি। সকাল ১১টার দিকে একটি পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন এক তরুণ সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, ‘ভাইয়া, সামনে কোনো সেফটি নেই, গুলি লাগতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘না, কিছু হবে না।’ এরপরই একটি গুলি তার মাথায় লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মাথার ঘিলু বের হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ ছটফট করার পর নিস্তব্ধ হয়ে যান।ঘটনাটি চোখের সামনে ঘটলেও আমি তাকে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করতে পারিনি, কারণ সামনে নিরাপদ অবস্থান ছিল না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখনও গুলি চালাচ্ছিল। পরে গুলির তীব্রতা কিছুটা কমলে আমরা তাকে উদ্ধার করি। অনেকে তখনই বলছিলেন, তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিই, হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরাই নিশ্চিত করতে পারবেন। এরপর তাকে মেডিকেলে পাঠানো হয়।আরেকজন তরুণও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। তিনি শারীরিকভাবে ভারী হওয়ায় আমি একা তাকে সরাতে পারিনি। পরে আমরা তাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু তিনি আমাদের হাতেই ছটফট করতে করতে মারা যান। নিজেদের কোলে নিজেদের ভাইকে এভাবে মারা যেতে দেখা আজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে।আমি জানি না সরকার আমাদের কতটা পুনর্বাসন করবে। এককালীন তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছি। অনেকেই সুস্থ-স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও এ ক্যাটাগরিতে সহযোগিতা পেয়েছেন। অথচ একটি হাত হারিয়েও আমি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছি। কয়েকবার ক্যাটাগরি পরিবর্তনের আবেদন করলেও কোনো সাড়া পাইনি। আমার সংগ্রামের বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও যদি আমার এমন অবস্থা হয়, তাহলে অন্যরাও কতটা সহায়তা পাচ্ছেন, তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। ভবিষ্যতে বিষয়টি বোঝা যাবে।প্রথমে আমি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম প্রতিবাদ জানানোর জন্য। পরে যখন দেখি ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গুলি চালাতেও দ্বিধা করছে না, তখন সিদ্ধান্ত নিই যে কোনো মূল্যে সরকারের পতন ঘটাতে হবে।তখন আমাদের স্বপ্ন ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ—যেখানে গুম-খুন থাকবে না, মানুষ গভীর রাতেও নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ এখনো পাইনি।
আমার প্রত্যাশা, দেশ এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাবে যেখানে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা যে স্বপ্ন নিয়ে অংশ নিয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিক। আমরা চাই দেশে গুম-খুন না থাকুক, রাজপথে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হোক।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত