প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
ফিরে দেখা ‘৩৬ জুলাই’
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
৫ আগস্ট সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের পরিণতি২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরবর্তীতে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করে। তীব্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন এবং এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। আজ ৫ আগস্ট সেই ঘটনার দুই বছর পূর্তি।২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বহাল রেখে হাইকোর্ট রায় দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১ জুলাই থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে চার দফা দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হয়। প্রথমদিকে কর্মসূচির মধ্যে ছিল বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও মহাসড়ক অবরোধ। ৭ জুলাই ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়, যা পরে সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে পরিচিতি লাভ করে।জুলাইজুড়ে রেল ও সড়কপথ অবরোধের পাশাপাশি অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই রাতে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। একই সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। পরদিন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে দেশব্যাপী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।সংঘাতের বিস্তারজুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করে। ১৫ জুলাই হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে দেশব্যাপী ইন্টারনেট বিভ্রাট দেখা দেয়। পরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে কারফিউ জারি করা হয়।দাবির পরিবর্তন ও আন্দোলনের পরিণতিপ্রথমদিকে আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। তবে দমন-পীড়ন ও হতাহতের ঘটনার পর আন্দোলন এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। এ সময় ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে সরকারি চাকরিতে ৭ শতাংশ কোটা বহাল রাখার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ জুলাই সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে তখন আন্দোলন কোটা সংস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়।২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। একই দিন অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। এরপর ৪ আগস্ট ৬ আগস্ট ‘ঢাকা অভিমুখে লং মার্চ’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও পরে সেটি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। ৫ আগস্ট দুপুরে তীব্র আন্দোলনের মধ্যে খবর আসে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। এই ঘটনার দুই দিন পর অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হচ্ছে।১৮ মাস ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার পর এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে জুলাইয়ের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব সামনে আনছেন অনেকে।হতাশার জায়গা কোথায়?২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু ইতিবাচক দিক সামনে এলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতে, অনেক প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। তাদের ভাষ্য, নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় মানুষ জীবনবাজি রেখে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশার সামান্য অংশও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি, যা ভবিষ্যতের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রকাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন। জনগণ গণভোটের পক্ষে রায় দিলেও সেটি এখনও কার্যকর করা হয়নি, যা হতাশাজনক। গত ১ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আগের মতোই বিরোধী দলের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।জুলাই-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের পরিচিত মুখদের মধ্যে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক অবস্থান দেখা গেছে। কেউ নিজ নিজ ছাত্রসংগঠনে ফিরে গেছেন, কেউ জুলাইভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আবার অনেকে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আলাদা অবস্থান নিয়েছেন। কয়েকজন কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না থেকে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছেন। আদর্শিক ও নেতৃত্বগত মতপার্থক্যের কারণেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা সক্রিয় রয়েছেন এবং জুলাইয়ের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে নিয়মিত মতামত প্রকাশ করছেন।বাংলা ট্রিবিউন জুলাই আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন আলোচিত নেতার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের অনেকে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের কথা তুলে ধরে হতাশার কথা জানান। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং আগের মতো ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা নেই।ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পরাজিত ভিপি প্রার্থী মেঘমল্লার বসু বলেন, জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু এখন অনেকেই কিছুটা হতাশ। তার মতে, বিভিন্ন ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে, অনেক কিছুই আগের মতো চলছে, সরকার ও বিরোধী দলের রাজনীতির ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাদের মধ্যে সমঝোতার চিত্র দেখা যাচ্ছে, মৌলবাদের উত্থান ও মব ভায়োলেন্স বেড়েছে—যা তারা প্রত্যাশা করেননি।এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন বলেন, জুলাই আন্দোলনে তাদের ব্যক্তিগত কোনো প্রত্যাশা ছিল না। তারা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার মতে, ফ্যাসিবাদী কাঠামো এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি, তাই অনেক সময় হতাশা তৈরি হয়। তবে ভবিষ্যতে আবারও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তরুণ প্রজন্ম নিশ্চুপ থাকবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত