প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
জুলাই বিপ্লব: রক্তাক্ত রাজপথের ঢেউ হাসপাতালেও
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের হাসপাতালগুলোতেও। আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগ সমর্থক সন্ত্রাসীদের হামলা এবং পুলিশের গুলিতে আহত মানুষের ঢল নামে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তৈরি হয় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। আহতদের আর্তনাদ, জীবন বাঁচানোর আকুতি এবং একের পর এক মরদেহ পৌঁছানোর ঘটনায় হাসপাতালের পরিবেশ হয়ে ওঠে রণক্ষেত্রের মতো।প্রত্যক্ষদর্শী, জুলাইযোদ্ধা ও চিকিৎসকদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই সময়ের হৃদয়বিদারক চিত্র। তারা জানান, গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি নিহতদের মরদেহও অবিরাম হাসপাতালে আনা হচ্ছিল। জরুরি বিভাগ, করিডোর, বারান্দা ও বিভিন্ন কক্ষ আহতদের যন্ত্রণাকাতর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছিল। অনেক ক্ষেত্রে এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে যেতে মরদেহ ডিঙিয়ে যেতে হয়েছে। আবার স্বজনেরা প্রিয়জনের খোঁজে এক হাসপাতালের মর্গ থেকে আরেক হাসপাতালের মর্গে ছুটে বেড়িয়েছেন।হাসপাতালজুড়ে আহতদের স্বজন, সহপাঠী ও সাধারণ মানুষের একটাই আবেদন ছিল—যেভাবেই হোক আহতদের জীবন বাঁচাতে হবে। তবে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেও অনেক আহত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডারদের হয়রানি ও হামলার মুখে পড়েন। এমনকি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে হামলা চালানোর অভিযোগও উঠে।সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসক ও জুলাইযোদ্ধাদের দাবি, আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ নির্বিচারে ছররা গুলি ব্যবহার করেছিল। এতে অসংখ্য মানুষের চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। কেউ এক বা দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান, আবার কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন। গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হননি, কেউ আবার প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। ফলে আহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আজও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের সংকটময় সময়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা নানা ঝুঁকি উপেক্ষা করে আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। যদিও কোথাও কোথাও জরুরি বিভাগের গেট বন্ধ রাখা হয়েছিল, আবার ভয়ের কারণে কিছু স্থানে চিকিৎসা দিতেও অস্বীকৃতি জানানো হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এক সাক্ষ্যে দাবি করা হয়, পঙ্গু হাসপাতালে আহতদের বিষয়ে ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’ নির্দেশ দিয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা।
সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. আবরার হামিম বলেন, ১৯ জুলাই রাতে জরুরি বিভাগে গিয়ে তিনি এমন এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছিলেন, যা আজও ভুলতে পারেননি। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ, একের পর এক গুলিবিদ্ধ মানুষ এবং মরদেহ আসছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যেতে মরদেহ ডিঙিয়ে যেতে হয়েছে। আতঙ্কের মধ্যেও তিনি গোপনে সেই দৃশ্য ভিডিও করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেসময় হাসপাতালে গণমাধ্যমের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত; কেবল একজন সাংবাদিককে আড়ালে ছবি তুলতে দেখেছিলেন।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত