প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
৫ আগস্ট: সেনাভবন থেকে বঙ্গভবন—অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে যেভাবে এগোয় ঘটনাপ্রবাহ
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি হয়। দুপুরের দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেছেন—এমন খবর দ্রুত রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের ঢল নেমে আসে এবং এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায় জনসমাগম চরমে পৌঁছে।একই সময়ে সেনাভবনে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা শুরু হয়। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তির বর্ণনা অনুযায়ী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আগের রাত থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেন। বিএনপির নেতা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের মাধ্যমে এ যোগাযোগের একটি অংশ সম্পন্ন হয়।৫ আগস্ট সকালে সেনাভবনে ফজলে এলাহী আকবরের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে সেনাপ্রধান তিনটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি জানান, সেনাবাহিনী কোনো ধরনের রক্তপাতের অংশ হবে না, ব্যক্তিগতভাবে তিনি ক্ষমতা গ্রহণে আগ্রহী নন এবং দেশের সংকট নিরসনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্রুত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব নেওয়ার জন্যও ফজলে এলাহী আকবরকে অনুরোধ করেন।বৈঠকের সময় সেনাপ্রধান জানান, ভারতের সেনাপ্রধান তার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করবেন। বিষয়টি শুনে ফজলে এলাহী আকবর বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান এবং পরে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নাগরিক ঐক্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের জানানো হয়, দুপুরে সেনাভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।দুপুরের পর সেনাভবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত হতে থাকেন। সেখানে উপস্থিতদের সেনাপ্রধান জানান, প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা কামনা করলে উপস্থিত নেতারা সম্মতি জানান।সেনাভবনের বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জোনায়েদ সাকি, ফিরোজ আহমদ, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, হামিদুর রহমান আজাদ, মাওলানা মামুনুল হক ও মুফতি ফয়জুল্লাহসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।বৈঠকে সেনাপ্রধানকে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার পরামর্শ দেন রাজনৈতিক নেতারা। একই সঙ্গে দ্রুত একটি বেসামরিক অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়ারও মত দেন তারা। সেনাপ্রধান বিএনপি মহাসচিব ও জামায়াতের আমিরকে জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাতে বলেন। তবে তারা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে বক্তব্য না দিয়ে বাইরে গিয়ে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।এরপর সেনাপ্রধান উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে বঙ্গভবনে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। শুরুতে কিছু দ্বিধা থাকলেও পরে সবাই এতে সম্মত হন। তবে বৈঠকে মুফতি ফয়জুল্লাহর উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি ওঠায় তাকে বঙ্গভবনে নেওয়া হয়নি।একটি মিনিবাস ও একটি জিপে রাজনৈতিক নেতারা বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হন। সেনাবাহিনীর গাড়িবহর তাদের নিরাপত্তা দেয়। পথে বিপুল জনসমাগমের কারণে গাড়িবহরের গতি ধীর হয়ে যায়। জাহাঙ্গীর গেট অতিক্রম করার পর জনতার ভিড়ে আটকে গেলে অধ্যাপক আসিফ নজরুল গাড়ি থেকে নেমে উপস্থিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। অন্যদিকে মিনিবাসে থাকা জিএম কাদের ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জনতার দৃষ্টি এড়াতে জানালার পর্দা টেনে নিচু হয়ে বসে থাকেন।মাগরিবের আজানের পর রাজনৈতিক নেতা ও সেনাবাহিনীর গাড়িবহর বঙ্গভবনে পৌঁছায়। সেখানে দরবার হলের পাশে একটি কক্ষে চরমোনাইর পীর মাওলানা ফয়জুল করীমের ইমামতিতে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা নামাজ আদায় করেন। পরে সেনাপ্রধানের সঙ্গে থাকা সেনা কর্মকর্তারাও নামাজে অংশ নেন এবং সে জামাতে ইমামতি করেন সেনাপ্রধান নিজেই।এরপর দরবার হলে বৈঠক শুরু হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন উপস্থিত হয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে করমর্দন করেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি পরে জানান, সে সময় রাষ্ট্রপতিকে বেশ বিমর্ষ ও উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছিল।বৈঠকের শুরুতে সেনাপ্রধান জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এবং দেশের পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রয়োজন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।আলোচনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। জামায়াতের আমিরসহ অন্য নেতারাও এ প্রস্তাবে সমর্থন জানান। রাষ্ট্রপতি প্রথমে বলেন, বিষয়টি ভবিষ্যৎ অন্তর্বর্তী সরকার বিবেচনা করতে পারে। তবে সেনাপ্রধান বলেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে নির্বাহী আদেশে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।বৈঠকের এক পর্যায়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কি না। রাষ্ট্রপতি জবাবে জানান, তিনি পদত্যাগপত্র পেয়েছেন।এ সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদুল হক দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় বিষয়ে মত দেন। তার বক্তব্য নিয়ে বৈঠকে ভিন্নমত সৃষ্টি হয়। পরে তিনি বলেন, তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।আলোচনায় মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, এ ধরনের কোনো স্থাপনা সম্পর্কে তার জানা নেই। তখন বিষয়টি নিয়ে সেনাপ্রধান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।বৈঠকে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতি জানান, এ বিষয়ে কিছু প্রক্রিয়াগত বিষয় রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা ফয়জুল করীম নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। জামায়াতের আমির বলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার গঠনের বিষয়ে তাদের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরে আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং দোয়া করা হয়।বৈঠক শেষে বঙ্গভবন থেকে জানানো হয়, দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান, লুটপাট ও সহিংসতা প্রতিরোধে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরদিন ৬ আগস্ট বঙ্গভবন থেকে সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত