প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
হাসিনার ভারত যাত্রা নিয়ে নতুন তথ্য, সামনে এলো রেসকিউ মিশনের নানা দিক
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত গমনের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার মধ্যে নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। একাধিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত এসব তথ্যে তাকে দেশত্যাগে সহায়তাকারী সামরিক কর্মকর্তা, ব্যবহৃত হেলিকপ্টার ও বিমান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পুরো রেসকিউ মিশনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার বা সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।সাবেক ও বর্তমান সামরিক সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে শেখ হাসিনার ভারত যাত্রা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এসব বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি কিছু স্পর্শকাতর তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।গত ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করে। পরে পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে জনতা গণভবনের দিকে অগ্রসর হলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় শেখ হাসিনাকে প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে গণভবন ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর বাণিজ্যমেলার কাছাকাছি এলাকায় বিমানবাহিনীর একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার অবতরণ করে। সেখানে কিছু সময় অবস্থানের পর শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে হেলিকপ্টারটি পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে।সূত্রগুলোর দাবি, গণভবন থেকে শেখ হাসিনা ও তার বোনকে বহনকারী হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন এয়ার কমোডর আব্বাস এবং কো-পাইলট ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির। বিকেল তিনটার দিকে হেলিকপ্টারটি কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে অবতরণ করে। এ সময় তেজগাঁও বিমানবন্দরে দায়িত্বে থাকা উইং কমান্ডার কানিজ ফাতেমা সংক্ষিপ্ত বেতার বার্তার মাধ্যমে ঢাকা ট্রাফিক কন্ট্রোলকে রেসকিউ মিশনের আওতায় সামরিক হেলিকপ্টারের উড্ডয়নের বিষয়টি অবহিত করেন।সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর এয়ার কমোডর আব্বাসকে প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময় শেষে তিনি দেশে ফিরে নিয়মিত দায়িত্বে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বিমানবাহিনী সদর দপ্তরের এয়ার হেডকোয়ার্টার ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত। অন্যদিকে কো-পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির বর্তমানে বাশার এয়ার বেইজে ওসি (অ্যাডমিন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো দেশত্যাগের বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়। গণভবন থেকে শেখ হাসিনাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি কেবল কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছিল। এ কাজে বিমানবাহিনীর স্পেশাল ফ্লাইং ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে গ্রহণ করতে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজের তৎকালীন কমান্ডার নিজেও উপস্থিত ছিলেন।নিরাপত্তা সূত্র জানায়, কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে আগে থেকেই ইঞ্জিন চালু অবস্থায় একটি সি-১৩০ জুলিয়েট সামরিক পরিবহন বিমান প্রস্তুত ছিল। বিমানের ভেতরে অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনার তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, তার স্ত্রী শাহিন সিদ্দিকী, তাদের দুই কন্যা এবং জামাতা।হেলিকপ্টার থেকে নেমে শেখ হাসিনা উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেন এবং আন্দোলনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। তখন তাকে গণভবনমুখী জনতার অগ্রযাত্রা ও অভ্যুত্থানের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে জানানো হয়। এর মাধ্যমে দেশের মাটিতেই তিনি তার দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের শাসনের অবসানের খবর জানতে পারেন।তবে আরেকটি সামরিক সূত্রের দাবি, পরিবারের সদস্যদের বিমানে পাঠানো হলেও অজ্ঞাত কারণে তারিক আহমেদ সিদ্দিকী নিজে ওই বিমানে ওঠেননি। পরদিন তিনি গোপনে চট্টগ্রামে যান এবং সেখান থেকে নৌপথে দেশত্যাগ করেন। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তাকে দেশত্যাগে সহায়তার অভিযোগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েলকে গ্রেফতার করা হয়।সূত্রের তথ্যমতে, ভারতের উদ্দেশে উড্ডয়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরিবহন বিমানটির ককপিটে আগে থেকেই পাইলট ও কো-পাইলট নিজ নিজ দায়িত্বে অবস্থান করছিলেন। পাইলট ছিলেন এয়ার কমোডর শামীম রেজা এবং কো-পাইলট ছিলেন উইং কমান্ডার মাহফুজ। বিমানটি ৫ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে দিল্লির উপকণ্ঠে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে।নিরাপত্তাজনিত কৌশলের অংশ হিসেবে উড্ডয়নের সময় বিমানের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়েছিল। প্রচলিত রুট এড়িয়ে কিছুটা ভিন্ন পথ ব্যবহার করে বিমানটি দিল্লির দিকে যায়। ফলে বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রমের আগ পর্যন্ত এটি রাডারে শনাক্ত হয়নি। ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশের পর পাইলট কলকাতা বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভারতে অবতরণের পর দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান।সূত্র আরও জানায়, শেখ হাসিনাকে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার পর ক্রু ও নিরাপত্তা সদস্যদের নিয়ে বিমানটি পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসে। পরে পাইলট এয়ার কমোডর শামীম রেজাকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য ফিলিপাইনে পাঠানো হয়। আর কো-পাইলট উইং কমান্ডার মাহফুজ বর্তমানে বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা পরিদপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন।একটি সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গণভবন থেকে শেখ হাসিনার রেসকিউ মিশন দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে হেলিকপ্টারে করে তাকে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে সেখান থেকে সামরিক বিমানে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হয়। পুরো কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন বিমানবাহিনীর তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি। তিনি ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহসভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফির ছেলে।৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আবু আহমেদ মান্নাফিও সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। এ সময় তার সঙ্গে ছোট ছেলে, সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর গৌরব এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা ছিলেন। পরে তাদের বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত সরকারি কোয়ার্টার ‘চন্দ্রিকা’য় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে একটি ফ্ল্যাটে তারা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং রেসকিউ মিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) এম সরোয়ার হোসেন বলেন, আইন অনুযায়ী পদত্যাগের পরও সাবেক রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসএসএফের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী। সে কারণে শেখ হাসিনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসএসএফ সদস্য ও সামরিক কর্মকর্তারা তাদের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এতে কোনো বেআইনি কাজ করেননি। তবে তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সে সময় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে যে কেউ গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে পারতেন এবং তার মতে, সেটিই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।
সূত্র: যুগান্তর
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত