প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ আগস্ট ২০২৬
খরায় শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রাইন
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
ইউরোপের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ রাইন নদীতে তীব্র খরা দেখা দিয়েছে। পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণে নেমে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। বড় জাহাজগুলোকে কম পণ্য নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আবার কিছু এলাকায় পণ্য নামিয়ে ছোট জাহাজ, ট্রাক ও রেলে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনেও চাপ তৈরি হচ্ছে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপে তীব্র দাবদাহ, দাবানল ও অস্বাভাবিক ঝড় দেখা গেছে। এর মধ্যেই নতুন করে ব্যাপক খরা দেখা দিয়েছে। এতে মহাদেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানির স্তর কমে গেছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে থাকা ইউরোপের জন্য এটি নতুন সংকট তৈরি করেছে।এই সংকটের অন্যতম কেন্দ্র রাইন নদী। সুইস আল্পস থেকে উত্তর সাগর পর্যন্ত প্রায় ৮০০ মাইল দীর্ঘ নদীটি ছয়টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ইউরোপের শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য রাইন শুধু একটি নদী নয়, বরং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডোর।আইএনজি ব্যাংকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান কার্সটেন ব্রজেস্কি বলেন, ‘এটি জার্মান অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হৃদ্যন্ত্রগুলোর একটি।’১৮৮০ সালের পর সর্বনিম্ন পানির স্তরচলতি সপ্তাহে রাইন নদীর পানির স্তর ১৮৮০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ওই বছর থেকেই নদীটির পানির স্তর সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিমাপ করা হচ্ছে।পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় রাইন দিয়ে পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জার্মানির শিল্প খাতে। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও করছে।একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিয়ুবে। পানির স্তর এতটাই কমেছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া কয়েকটি যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষও এখন দৃশ্যমান হচ্ছে।দানিয়ুব নদীর পানি ব্যবহার করে হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি ঠান্ডা করা হয়। পানির সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই দেশের সরকার নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।কমছে জাহাজের পণ্য বহনের সক্ষমতাজার্মানির ডুইসবুর্গ বন্দরে সংকটের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় জাহাজ থেকে পণ্য নামিয়ে ছোট নৌযান, ট্রাক ও রেলে স্থানান্তর করা হচ্ছে।নদীর কয়েকটি অংশে পানির গভীরতা চার ফুটের সামান্য বেশি থাকায় নিরাপদে চলাচলের জন্য অনেক জাহাজকে তাদের বহন করা পণ্যের দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামিয়ে ফেলতে হচ্ছে।রটারডাম থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে আসা ৫৬৪ ফুট দীর্ঘ জাহাজ ডব্লিউ. ডি বেইজার সিনিয়রের নাবিক উইলমা ভ্যান ইনজেন বলেন, ‘এখন বোঝা যায় কে ভালো নাবিক আর কে খারাপ নাবিক।’স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জাহাজটি ৫ হাজার টন পণ্য পরিবহন করতে পারে। কিন্তু পানির সংকটের কারণে বর্তমানে এর সক্ষমতা কমে মাত্র ১ হাজার ২০০ টনে দাঁড়িয়েছে।ডুইসবুর্গ বন্দরের প্রধান নির্বাহী মার্কুস বাঙ্গেন বলেন, ‘আমরা আমাদের সীমার মধ্যে কাজ করছি।’প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি টন পণ্য এই বন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ পথে ২০ হাজারের বেশি জাহাজ চলাচল করে।শিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রাইনজার্মানির শিল্পশক্তি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে রাইন নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বিএএসএফ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বায়ার ও থাইসেনক্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।প্রতি বছর রাইন নদীপথে প্রায় ৩০ কোটি টন পণ্য পরিবহন করা হয়। উত্তর সাগরের রটারডাম বন্দরকে জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে এই নদী।আইএনজির কার্সটেন ব্রজেস্কি বলেন, একটি বড় নৌযানে পরিবহন করা পণ্যের বিকল্প হিসেবে প্রায় ১০০টি ট্রাক অথবা একটি পূর্ণ মালবাহী ট্রেন প্রয়োজন হতে পারে।তবে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থাও সহজ নয়। রেল ব্যবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এর পাশাপাশি নির্মাণকাজের কারণে নদীর পাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ বন্ধ রয়েছে।২০১৮ সালের ভয়াবহ খরার সময় রাইন নদীর পানির স্তর ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। তখন কয়েকটি কারখানা বন্ধ করতে হয়েছিল। বিশ্লেষকদের হিসাবে, ওই সংকটের কারণে জার্মানির মোট উৎপাদন ০.৩ শতাংশ কমেছিল।জার্মান অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন শিল্প সংগঠনের পরিচালক ইয়েন্স শোয়ানেন বলেন, ‘পানি জাদুর মতো তৈরি করা সম্ভব নয়।’তবে আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু প্রস্তুতি নিয়েছে। কম পানির সময়ে পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে মজুত সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি গভীর পানির বন্দরে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে।সিমেন্স এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠান, যাদের ভারী যন্ত্রপাতি রেল বা সড়কপথে পরিবহন করা কঠিন, তারাও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।অগভীর পানিতে চলতে সক্ষম নতুন ধরনের জাহাজও তৈরি করা হচ্ছে। এসব নৌযানে ছোট আকারের একাধিক প্রপেলার ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে কম গভীরতার পানিতেও চলাচল করা যায়।তবে এই পরিবর্তন খুব ধীরগতিতে হচ্ছে। রাইন নদীতে চলাচলকারী প্রায় ৮ হাজার পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে মাত্র কয়েকটি কম পানির জন্য বিশেষভাবে নির্মিত।অর্থনীতিতে ক্ষতির শঙ্কা বাড়ছেকম পরিমাণ পণ্য পরিবহন, জাহাজের ধীরগতির চলাচল এবং বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহারের কারণে ব্যয় বাড়ছে। জার্মানির কার্টেল অফিস জানিয়েছে, নদীপথে পরিবহন করা জ্বালানির কারণে ভোক্তাদের প্রতি লিটার পেট্রলের জন্য ১১ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে।জার্মানির কিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় পানির স্তর কম থাকলে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে এবং এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও কমে যায়।গবেষণায় বলা হয়েছে, এক মাস ধরে পানির স্তর কম থাকলে জার্মানির শিল্প উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ কমতে পারে।কিল ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক স্টেফান কুথস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে স্থবিরতার মধ্যে থাকা জার্মান অর্থনীতির জন্য এই ক্ষতি গুরুত্বপূর্ণ।জলবায়ু ও বৈশ্বিক সংকটে দ্বিমুখী চাপরাইন নদীর সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সংকটও ইউরোপের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদাব প্রণালিতে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতিতেও।মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুনে সুদের হার বাড়িয়েছে।একদিকে চীনের সস্তা পণ্যের প্রবাহ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি—দুই দিক থেকেই ইউরোপ বাণিজ্যিক চাপের মধ্যে রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক সংকট একই সময়ে ইউরোপের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।আল্পস অঞ্চলে শীতকালে কম তুষারপাতের কারণে এ বছর নদীগুলোতে পানির প্রবাহ কমেছে। এরপর বৃষ্টির ঘাটতি ও তীব্র গরমের কারণে নদীর পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহেও বৃষ্টিহীন তীব্র গরম অব্যাহত থাকতে পারে।
সূত্র: আমার দেশ।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত