প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না: প্রেসিডেন্ট
মোঃ রাজিব হোসেন। ||
প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাধারণ মানুষের যুদ্ধ। এটি ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানুষের ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না; জনগণের রায় উপেক্ষা করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ফলেই এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জনগণের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেননি। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের বহু ঘটনা, ত্যাগ ও বীরত্বগাথা এখনো যথাযথভাবে ইতিহাসে স্থান পায়নি। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছেও অজানা রয়ে গেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাস সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।শুক্রবার (৭ আগস্ট) ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস-এর ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।প্রেসিডেন্ট বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং সৈনিক নিজেদের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সমঅধিকার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই।তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন কী ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাদের কাজ করতে হবে এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।এ সময় তিনি বলেন, দেশে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তা সংশোধন করবে। তবে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা উচিত নয়।মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। শারীরিক সক্ষমতার কারণে কাউকে যুদ্ধে নেওয়া সম্ভব না হলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়তেন। দেশের জন্য যুদ্ধ করার সুযোগ পেতে কেউ কেউ নিজ গাড়ির সামনে পর্যন্ত শুয়ে পড়তেন।তিনি এসব ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন।প্রেসিডেন্ট বলেন, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের ভোটের কোনো মূল্য দেয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু সেই গণরায় উপেক্ষা করা হয়।এরপর পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালানোর পাশাপাশি ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জনগণকে আশ্বস্ত করা বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কার্যকর পরিস্থিতি না থাকায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন।তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সীমিতসংখ্যক সৈনিকের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র ও যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছে যায়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সৈনিক ও কর্মকর্তারা এসব যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।এ সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে উল্লেখ করেন।তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্য যুদ্ধে অংশ নেননি। দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং মা-বোনের সম্মান রক্ষার জন্যই তারা অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধারণা করেছিল বাঙালিরা যুদ্ধ করতে সক্ষম নয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন।যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রধান সেনাপতির নির্দেশে নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য বিভিন্ন ইয়্যুথ ক্যাম্প থেকে তরুণদের নিয়োগ করেছিলেন তিনি। সীমান্ত এলাকার ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী দেশের জন্য যুদ্ধ করার অপেক্ষায় ছিল। কঠোর জীবন, সীমিত খাবার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সত্ত্বেও তারা যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে এবং দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে উদগ্রীব ছিল।বক্তব্যে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশের সাহসী সামরিক ও বেসামরিক মানুষের অবদান এবং আত্মত্যাগের বিভিন্ন ঘটনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর বিদেশে সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সময় তিনি কামালপুরসহ বিভিন্ন যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার ঘটনা তুলে ধরতেন। এসব শুনে বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকেরা বিস্মিত হতেন। তারা মন্তব্য করতেন, এমন আক্রমণ কোনো পেশাদার বাহিনীর পক্ষেও সম্ভব নয়; কেবল যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, তারাই এমন অসাধারণ সাহসিকতা দেখাতে পারে।স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মানুষ যে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, সেটিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।একই সঙ্গে রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, চারবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন। পাক বাহিনী ঢাকা শহরে তাকে খুঁজে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ সময় তিনি তার স্ত্রী প্রয়াত দিলারা হাফিজের কথাও স্মরণ করেন।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছিল ছোট। তবে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গের অদম্য মানসিকতাই ছিল সেই বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মেজর এ মতিন চৌধুরী।সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।এর আগে রাত ৮টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।প্রেসিডেন্টের বক্তব্য শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। পরে সংগঠনের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিরান হামিদুর রহমান উপস্থিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানান।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত