প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬
অবৈধভাবে থাকা ৩,১১২ ভারতীয়কে দ্রুত ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ
স্টাফ রিপোর্টার। ||
বাংলাদেশে বর্তমানে ১৮ হাজার ৪৫৩ জন ভারতীয় নাগরিক বৈধভাবে বসবাস করছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ১১২ জনের ভিসার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এরপরও নানা অজুহাতে তারা নিজ দেশে ফিরছেন না। ফলে বর্তমানে তারা বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। এদের একটি বড় অংশ তৈরি পোশাক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক এবং বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা হিসেবেও অনেকে কাজ করছেন।বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিংক ট্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈধভাবে বসবাসরত ভারতীয় নাগরিকদের বাইরে বিভিন্ন খাতে আরও কয়েক লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের অনেকে পর্যটক কিংবা ভিসা অন অ্যারাইভাল নিয়ে দেশে প্রবেশের পর ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও অবস্থান করছেন। এভাবে ওভার-স্টে করার কারণে অবৈধ ভারতীয় কর্মীর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ব্যক্তির অনেকের কোনো টিন সার্টিফিকেটও নেই।তথ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের বেশিরভাগই তৈরি পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল, প্রযুক্তি খাত, বায়িং হাউস, বিভিন্ন এনজিও এবং লজিস্টিকস খাতে কাজ করছেন। তাদের অবৈধভাবে অবস্থান করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার কারণে যোগ্য ও দক্ষ বাংলাদেশি নাগরিকরা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তারা প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে ৪৯ হাজার কোটি টাকা ভারতে পাঠাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের অধিকাংশই অন অ্যারাইভাল ও পর্যটক ভিসায় দেশে এসেছেন। যাদের ভিসার মেয়াদ অনেক আগে শেষ হয়েছে কিংবা ইতোমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের দ্রুত দেশত্যাগ অথবা ভিসা নবায়নের আহ্বান জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে অভিযোগ রয়েছে, বারবার বলা হলেও তারা এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) জানিয়েছে, সম্প্রতি অবৈধভাবে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের দ্রুত বাংলাদেশ ছাড়ার বিষয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যারা বাংলাদেশে থাকতে চান, তাদের ভিসা নবায়নের জন্য বলা হয়েছে। ভিসা নবায়ন না করলে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শক্ত পদক্ষেপ না থাকায় দেশে অবৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তবে এর পেছনে কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে অনেক অবৈধ বিদেশি বাংলাদেশে চাকরি পাচ্ছেন এবং চাকরির সুবাদে দেশেই অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে তারা পুলিশকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়ও সম্পৃক্ত রয়েছে। তবে অবৈধভাবে অবস্থানরত এসব বিদেশি নাগরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়াতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অবৈধভাবে বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দেশে থাকা যাবে না। বৈধভাবে অবস্থান না করলে দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো অজুহাত গ্রহণ করা হবে না।নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এয়ার কমডোর (অব.) ইশফাক এলাহি চৌধুরী বলেন, অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনকে কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে।পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য বিদেশি নাগরিকদের ৩৩ ধরনের ভিসা দেওয়া হয়। তবে অনেক বিদেশি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশে অবস্থান করছেন। বিশেষ করে ভিসা অন অ্যারাইভাল ও ব্যবসায়িক ভিসা ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম ১৫ দিন প্রতিদিন এক হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করা যায়। ১৫ দিন পার হলে ৯০ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন দুই হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়। আর ৯০ দিনের বেশি অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিদিন তিন হাজার টাকা করে জরিমানার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত জরিমানা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেশত্যাগ করতে পারেন।সূত্র জানায়, গত ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের ভিসা নিয়ে ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশে আসছেন। এর মধ্যে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও পর্যটক ভিসা রয়েছে। অনেক ভারতীয় নাগরিকের তথ্য হালনাগাদ ছিল না। আবার অনেকে বাংলাদেশে অবস্থান করলেও ভিসার মেয়াদ বাড়াননি। কেউ কেউ নতুন ভিসা নেওয়ার পরও সেই তথ্য ডেটা এন্ট্রি করেননি। ফলে ইমিগ্রেশন সিস্টেমে নতুন পাসপোর্ট ও ভিসা নেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য হালনাগাদের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ১১২ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।এসবির এক কর্মকর্তা জানান, গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় একজন ভারতীয় নাগরিক টেক্সটাইল প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। তার ভিসার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হলেও তিনি নতুন করে ভিসা নবায়ন করেননি। পুলিশ ডেটা যাচাই করে তার কাছে গিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় দ্রুত ভিসা নবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। তা না হলে দ্রুত বাংলাদেশ ছাড়ার কথাও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ওই পোশাক কারখানার মালিককেও বিষয়টি অবহিত করেছে পুলিশ।ভারতের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের অবৈধ নাগরিকদের শনাক্ত করতেও রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করছে এসবির টিম।সূত্র জানায়, বাংলাদেশে কয়েকটি চলমান প্রকল্পে বেশ কিছু ভারতীয় নাগরিক কাজ করছেন। তাদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হলে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় তাদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে দেশত্যাগের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ঢাকার বাইরের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও অবৈধভাবে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকরা চাকরি করছেন। একইভাবে আইটি ও টেলিকম খাতেও তাদের অনেকে কর্মরত। পুলিশ তাদের নতুন করে ভিসা নবায়নের জন্য বলেছে।সূত্র আরও জানায়, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেসরকারি খাতে ভারতীয়দের কিছু বিনিয়োগ রয়েছে। তাদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা তা নবায়ন করেননি। একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা দ্রুত বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু এখনো অনেকে দেশত্যাগ করেননি।অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৬৪’-এর আওতায় সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করার বিধান রয়েছে। তবে দুর্বল আইনি কাঠামোর সুযোগ নিয়ে অনেক বিদেশি নাগরিক দেশে অবস্থান করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।এসবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ৮৩ হাজার ৬৮২ জন বিদেশি নাগরিক বৈধভাবে বসবাস করছেন।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত