প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস, সংসারের জন্য বিসর্জন দেওয়া স্বপ্ন পূরণ আলী আকবরের
স্টাফ রিপোর্টার। ||
‘বয়স কেবল একটি সংখ্যা’—ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই যে অতিক্রম করা অসম্ভব নয়, তা প্রমাণ করেছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর। ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।জীবনের দীর্ঘ সময় সংসারের অভাব-অনটন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রামে কেটেছে তার। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে পিছনে ফেলেছিলেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সেই পুরোনো স্বপ্ন আবার তাকে পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনে।আলী আকবর বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার মোল্লা শেখ খোকার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি আলী আজম নামে পরিচিত।রাজশাহীতে চাকরি করার সুবাদে নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখায় ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকেই এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবার পরীক্ষায় বসেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।আলী আকবর জানান, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে ছোটবেলাতেই পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। পরে বিয়ে করেন। তার সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে আসে। সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে গিয়ে তাকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।একপর্যায়ে স্ত্রীকে নিয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মচারী হিসেবে চাকরি শুরু করেন আলী আকবর। স্বামী-স্ত্রী দুজনের উপার্জনের মাধ্যমে সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যান। তার বড় মেয়ে বর্তমানে নার্সিং পেশায় যুক্ত। ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন এমবিবিএস ডাক্তার হয়ে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।আলী আকবর বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে নিজের পড়াশোনার ইচ্ছাকে ত্যাগ করেছিলেন। মেয়েকে নার্স এবং ছেলেকে ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এখন সন্তানরা নিজেদের কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাই জীবনের অবশিষ্ট সময় আর বসে না থেকে নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।তিনি বলেন, এরপর আবার পড়াশোনা শুরু করেন এবং ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবারেই জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ায় তিনি আনন্দিত। তার ভাষায়, এই আনন্দ প্রকাশ করার মতো ভাষা তার নেই।বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আলী আকবর বলেন, শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। পরীক্ষায় ভালো করতে হলে মনোবল, মনোযোগ ও কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন। অপ্রয়োজনে মোবাইল গেম খেলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় না দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলে ভালো ফল করা সম্ভব। তিনি নিজেকে এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।আলী আকবরের ছেলে ডাক্তার ইসমাইল হোসেন বলেন, তার বাবা প্রায়ই নিজের পড়াশোনার আগ্রহের কথা বলতেন। কিন্তু পারিবারিক অভাব এবং সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বের কারণে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। বর্তমানে তিনি ও তার স্ত্রী দুজনই ডাক্তার। তার বড় বোন নার্সিং পেশায় আছেন এবং বোন জামাই শিক্ষকতা করেন।তিনি আরও বলেন, বাবার অপূর্ণ স্বপ্নের বিষয়টি তারা জানতেন। এ কারণে তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এবার তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। সামনে তাকে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাবার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।পেড়াবাড়িয়া মহল্লার সাবেক কমিশনার আবু হেনা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ৫৪ বছর বয়সে আলী আকবরের এসএসসি পাস করা তাদের জন্য গর্বের বিষয়। এই বয়সে পড়াশোনা শুরু করে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া তার দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায়ের পরিচয়। তার এই সাফল্য এলাকার তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার। পেড়াবাড়িয়া মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে তিনি আলী আকবরকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানান।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত