প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রত্নতত্ত্বকে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ, সংরক্ষণের নামে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল
ডেক্সট রিপোর্ট। ||
অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সেবাস্তিয়ার রোমান স্তম্ভগুলোর ওপরের পাহাড়ি ঢালে রয়েছে বিস্তীর্ণ জলপাই বাগান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো। স্থানীয় জমির মালিক আবু মুদিফ জানান, তাকে একটি নোটিশ দিয়ে বলা হয়েছে, তার জমিও সেই ৪৫০ একর এলাকার অন্তর্ভুক্ত, যা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ দখলে নিতে যাচ্ছে। ইসরাইলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বড় একটি জাতীয় উদ্যান নির্মাণ এবং প্রাচীন স্থানটির সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।সাধারণত এ ধরনের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি মালিকদের সামান্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয় না। ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব পেলেও অধিকাংশ ফিলিস্তিনি তা গ্রহণ করেন না। তাদের ধারণা, ক্ষতিপূরণ নেওয়া মানে পৈতৃক জমি হারানোর বিষয়টিকে মেনে নেওয়া।আবু মুদিফের কাছে জমি হারানোর অর্থ শুধু আয়ের বড় একটি উৎস হারানো নয়। এর সঙ্গে তার অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের বিষয়টিও জড়িত। নিজের অনুভূতি বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, জমি হারানোর অনুভূতি যেন শরীর থেকে আত্মা আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো। জমি ছাড়া নিজেকে তিনি কল্পনা করতে পারেন না।স্থানীয় রেস্তোরাঁ মালিক নাহেদ সাখাও উচ্ছেদের আশঙ্কায় রয়েছেন। তার মতে, হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করাই ইসরাইলি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে। এখানে প্রাচীন ইহুদি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের পাশাপাশি রোমান, ক্রুসেডার ও অটোমান যুগের বিভিন্ন নিদর্শনও রয়েছে। নাহেদ জানান, খননকাজের পাশাপাশি বর্তমানে পুনরুদ্ধারের কাজও চলছে। জমির মালিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা নিজেদের জমি ব্যবহার বা সেখানে চাষাবাদ করতে পারবেন না।ইউনেস্কোর উদ্বেগ ও বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিসেবাস্তিয়াকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর অবস্থানেও। সংস্থাটি সেবাস্তিয়াকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’-এর তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইউনেস্কোর মতে, পরিকল্পিত ভূমি দখল এবং ‘সমরিয়া’ বা শোমরন ন্যাশনাল পার্ক তৈরির উদ্যোগ স্থানটির জন্য বড় হুমকি। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে ঐতিহ্যবাহী স্থানটি বিভক্ত হয়ে যেতে পারে।সেবাস্তিয়ার প্রবেশপথের একদিকে প্রাচীন রোমান যুগের ফোরাম এবং অন্যদিকে ব্যাসিলিকার স্তম্ভ রয়েছে। প্রত্নস্থলের মাঝামাঝি একটি পথে দাঁড়িয়ে ধ্বংসাবশেষের পাশে পড়ে থাকা আবর্জনার দিকে তাকিয়ে ছিলেন গ্রামের মেয়র মোহাম্মদ আজেম। তিনি জানান, স্থানীয়রা এখন এলাকাটি পরিষ্কার করতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ, সেখানে গেলে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।মেয়র আজেম যে পথটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেটি পুরো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। এর একটি অংশ পশ্চিম তীরের ‘এলাকা বি’-এর মধ্যে পড়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের বেসামরিক প্রশাসন এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অপর অংশটি ‘এলাকা সি’-এর অন্তর্ভুক্ত, যেখানে বেসামরিক ও নিরাপত্তা—দুই ধরনের নিয়ন্ত্রণই ইসরাইলের হাতে।গত সপ্তাহে পশ্চিম তীরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর লক্ষ্যে ইসরাইল প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ শেকেল বা ২৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছে। এসব প্রকল্পের কিছু এমন এলাকাতেও রয়েছে, যেগুলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রশাসনের অধীন।প্রাচীন রোমান থিয়েটারের ধ্বংসাবশেষের সামনে ইসরাইলি অধিকারকর্মী অ্যালন আরাদ বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসন ও সেবাস্তিয়ার বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই এসব উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি ইসরাইলি সংগঠন ‘এমেক শাভেহ’-এর প্রধান। সংগঠনটি কাজ করে যাতে এই অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য সব সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত থাকে।অ্যালন আরাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেবাস্তিয়া ইসরাইলের মালিকানাধীন কোনো স্থান নয়; এটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের অংশ। স্থানটির উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করেই তা করা উচিত, যাতে স্থানীয়রাও এর সুফল পান।ইসরাইলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেবাস্তিয়ার প্রবেশপথ বিশাল প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার অন্য প্রান্তে সরিয়ে নেওয়া হবে। নতুন প্রবেশপথটি বর্তমান গ্রাম, পার্কিং এলাকা ও দোকানপাট থেকে অনেক দূরে হবে।ফিলিস্তিনের পর্যটন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করছে, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি সেবাস্তিয়ায় ইসরাইলের ভূমি দখলের বিরোধিতায় আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তকে পশ্চিম তীরের সঙ্গে ইহুদিদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আড়াল করার ফিলিস্তিনি প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার ভোটের মাধ্যমে ইতিহাস বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।হেরোডিয়াম ও আইনি বিরোধপশ্চিম তীরের আরও দক্ষিণে জেরুজালেমের কাছেই অবস্থিত হেরোডিয়াম। এটি একটি কৃত্রিম পাহাড়, যার শীর্ষে খ্রিষ্টপূর্ব যুগের ঠিক আগে জুদিয়া রাজ্যের শাসক রাজা হেরড একটি বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন।সম্প্রতি এই এলাকাতেও ইসরাইল প্রায় ৮০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইসরাইলের দাবি, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্যই জমি নেওয়ার এই উদ্যোগ।তবে ইসরাইলি বসতি স্থাপন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ‘পিস নাউ’-এর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইন এবং ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী শুধু বসতি স্থাপন কিংবা কেবল ইসরাইলি নাগরিকদের সুবিধার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।সংগঠনটির মতে, জমি অধিগ্রহণকে বৈধ হিসেবে উপস্থাপনের জন্য রাষ্ট্র সম্ভবত দাবি করবে যে জায়গাটি ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি—উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত হবে। তবে তাদের ধারণা, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বসতি সম্প্রসারণ এবং ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা।হেরোডিয়ামে খননকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং দর্শনার্থীদের গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শ্মুয়েল ব্রাউনস মনে করেন, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থান রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব ইসরাইলি প্রত্নতাত্ত্বিক ও কর্মকর্তাদেরই নেওয়া উচিত। তার মতে, এই ভূমির প্রত্নতত্ত্ব, নিদর্শন ও ইতিহাস রক্ষার বিষয়ে ইসরাইলের দায়িত্ববোধ রয়েছে।ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা?ইসরাইলের বর্তমান সরকারের কট্টর ডানপন্থি সদস্যদের মধ্যে এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থানের নজির দেখা গেছে। চলতি বছরের শুরুতে একটি নতুন আইন প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবিত আইনে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ সামরিক কর্তৃপক্ষের অধীন বেসামরিক প্রশাসনের কাছ থেকে ইসরাইলের ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে।আইনটি পাস হলে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণের নামে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। মে মাসে পার্লামেন্টে বিলটির প্রথম পাঠ সম্পন্ন হলেও সামনে নির্বাচন থাকায় এটি বর্তমানে স্থগিত রয়েছে।সেবাস্তিয়ায় ফিরে ইসরাইলি অধিকারকর্মী অ্যালন আরাদ বলেন, এমন একটি বিল উত্থাপনই দেখিয়ে দেয় যে পশ্চিম তীরে প্রত্নতত্ত্ব কীভাবে একটি হাতিয়ার বা ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।তার মতে, প্রত্নতত্ত্বকে ব্যবহার করে খননকাজ পরিচালনা, ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা তৈরি এবং নিজেদের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের জমি নিয়ে তা ইসরাইলিদের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।সেবাস্তিয়ার ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের মধ্যে এখন আশঙ্কা বাড়ছে, প্রাচীন এই প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা তাদের গভীর সম্পর্ক হয়তো একসময় চিরতরে হারিয়ে যাবে।
সূত্র: বিবিসি।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত