প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬
বিজেপি-মোদির সুসময় কি শেষের পথে?
ডেক্স রিপোর্ট। ||
কখনো কখনো যে শক্তি একজন নেতাকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখে, সময়ের পরিবর্তনে সেটিই তার জন্য বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারের ক্ষেত্রেও এমন একটি পরিস্থিতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রায় এক যুগ ধরে বিজেপির ক্ষমতায় থাকার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, বিজেপি সরকারের তুলনায় মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বেশি। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের কারণেই বিজেপি টানা তিনটি সাধারণ নির্বাচনে জয় পেয়েছে।মোদির বক্তব্য ও রাজনৈতিক ভাষাতেও তার নেতৃত্বের এই অবস্থান স্পষ্ট। শক্তিশালী অনেক নেতার মতো তিনিও নিজের কথা বলার সময় অনেক ক্ষেত্রে ‘আমি’র পরিবর্তে নিজের নাম কিংবা তৃতীয় পুরুষে নিজেকে উল্লেখ করেন। তার রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দও তাকে দলের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তুলে ধরে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতির কথা বলার পরিবর্তে প্রায়ই সামনে আসে ‘মোদি কি গ্যারান্টি’ বা মোদির নিশ্চয়তার বিষয়টি।বিজেপির অন্য নেতাদের বক্তব্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। মোদির প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশ না করে অনেক বক্তব্যই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিভিন্ন সরকারি ঘোষণা বা সাফল্যের ক্ষেত্রেও বলা হয়, এসব কিছুই ঘটেছে ‘আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে’। এমনকি কোনো মন্ত্রী নিজে কোনো কাজের জন্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য হলেও তিনি সেটির কৃতিত্ব মোদির নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার ওপরই দিয়ে থাকেন।মোদির সমালোচকেরা এই অতিরিক্ত প্রশংসা ও আনুগত্য নিয়ে ব্যঙ্গ করলেও একটি বিষয় তারা অস্বীকার করতে পারেন না—মোদির জনপ্রিয়তা বিজেপির ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। তার নেতৃত্বে বিজেপি যেসব সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, সেগুলোতে দলটির ভোটের হার মোটামুটি ৩১ থেকে ৩৬ শতাংশের মধ্যে ছিল।‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর জরিপে দেখা গেছে, নানা সমস্যার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে ৩৬ শতাংশ ভোটার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন। মোদির মতো ট্রাম্পেরও একটি শক্তিশালী ও অনুগত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে, যারা বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও তার পাশে থাকে। বিজেপির প্রায় ৩৬ শতাংশের মূল ভোটভিত্তি মোদির বড় রাজনৈতিক অর্জন। মোদি নিজেও জানেন, তাকে ছাড়া বিজেপি বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে পারত কি না, তা বড় প্রশ্ন।তবে মোদির বর্তমান অবস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের চেয়ে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সময়ের তুলনা বেশি প্রাসঙ্গিক। জনপ্রিয়তা ও বিরোধিতার পাশাপাশি চলার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রতিবাদমোদির জনপ্রিয়তা ব্যাপক হলেও তিনি ইন্দিরা গান্ধীর জনপ্রিয়তার সেই পর্যায়ে কখনো পৌঁছাতে পারেননি। ১৯৭১ সালে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কারের পর সাংগঠনিক ভিত্তি ছাড়াই ইন্দিরার নেতৃত্বে গঠিত নতুন কংগ্রেস ৪৩ শতাংশ ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ১৯৮০ সালে রাজনৈতিকভাবে তার প্রত্যাবর্তন অসম্ভব মনে করা হলেও তিনি আবারও ৪৩ শতাংশ ভোট পান। আর ১৯৮৪ সালে তার হত্যার পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কংগ্রেসের ভোটের হার দাঁড়ায় ৪৮ শতাংশে।ইন্দিরার সেই জনপ্রিয়তার সঙ্গে বর্তমান বিজেপির প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোটের তুলনা করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। অথচ এত জনপ্রিয়তার পরও এমন এক সময় এসেছিল যখন ইন্দিরা গান্ধী নিজের তৈরি কংগ্রেসের জন্যই বোঝা হয়ে উঠেছিলেন।১৯৭৪ সালে ইন্দিরা সরকারের দুর্নীতি ও বিতর্কিত শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ব্যাপক আকার নেয়। ১৯৭৫ সালের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে যায় যে তার ক্ষমতায় থাকা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়। জরুরি অবস্থা জারি এবং ১৯৭৬ সালের নির্ধারিত নির্বাচন পিছিয়ে না দিলে তিনি সম্ভবত পরাজিত হতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচন স্থগিত করেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি তার পক্ষে যায়নি। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে এবং ইন্দিরা গান্ধী নিজেও নিজের আসন হারান।মোদির জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ইতিহাস বিবেচনায় রাখা জরুরি। অনেকে যন্তর মন্তরের সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু সেই তুলনা পুরোপুরি যথাযথ নয়। যন্তর মন্তরের আন্দোলনকারীরা ছিলেন শান্তিপূর্ণ এবং তাদের লক্ষ্য পুরো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা ছিল না।বরং বর্তমান বিক্ষোভের সঙ্গে ১৯৭৪-৭৫ সালের ছাত্র আন্দোলনের তুলনা বেশি যুক্তিসংগত। সেই সময় ছাত্রদের ক্ষোভের প্রতিটি কারণের জন্য ইন্দিরা গান্ধী সরাসরি দায়ী ছিলেন না। ১৯৭৩ সালে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি সংকটে পড়ে এবং নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। কিন্তু ইন্দিরা যেভাবে দেশ পরিচালনা করছিলেন, তাতে তাকে ‘সর্বোচ্চ নেত্রী’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ফলে আন্দোলনকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন তিনিই।তখন আন্দোলনের মূল বক্তব্য অনেকটা এমন ছিল—দেশে যা ভালো হয়েছে তার কৃতিত্ব যদি আপনি একাই নিতে চান, তাহলে খারাপ যা কিছু ঘটছে তার দায়ও আপনাকেই নিতে হবে। মোদির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।কেউ যখন নিজেকে ‘সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, তখন তিনিই আবার ‘সর্বোচ্চ লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে থাকেন। অবশ্য এখন পর্যন্ত মোদি সত্তরের দশকের মাঝামাঝি ইন্দিরা গান্ধীর মতো ব্যাপক অজনপ্রিয়তার মুখে পড়েননি। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে কিছু মিল রয়েছে।গত এক দশকে মোদি নিজের যে অজেয় ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভকারীদের নির্ভীক আচরণ এবং তাকে নিয়ে উপহাস সেই ভাবমূর্তিতে আঘাত করেছে।দুটি উপনির্বাচনে বিজেপির সাম্প্রতিক পরাজয়কে হয়তো খুব বড় করে দেখার প্রয়োজন নেই। তবে বিহারের পরাজয় ছিল একই সঙ্গে অপ্রত্যাশিত ও নজিরবিহীন। হিন্দি বলয়ে বিজেপিকে অত্যন্ত শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ বিহারে দলের অন্যতম নিরাপদ আসন এমন একজন প্রার্থীর কাছে চলে গেছে, যিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, তার লক্ষ্য বিজেপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া।ছাত্রদের বিক্ষোভ চলাকালে এক সপ্তাহ ধরে মোদিকে অস্বস্তিকর অবস্থায় দেখা গেছে। আন্দোলনের পর তাকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দিতে হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর জন্য তার নেওয়া উদ্যোগগুলোও খুব একটা স্বস্তিদায়ক হয়নি। তার ‘সেলফি ভিডিও’ প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। একইভাবে ছাত্রদের তাকে অপমান করার ঘটনা ক্ষমা করে দেওয়ার যে আড়ম্বরপূর্ণ ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, সেটিও মানুষের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য হয়নি।‘মহান নেতা’কে অপমান করার অভিযোগে তরুণ ও শিশুদের ভিডিও করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার যে কৌশল বিজেপি নিয়েছে, তাতে বরং সেই ‘সম্রাটসুলভ’ ভাবমূর্তিই আরও শক্ত হয়েছে—যেখানে ছাত্রদের ক্ষোভ ও অভিযোগের চেয়ে নেতার অহংবোধে আঘাত লাগার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয়েছে।সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে বিজেপি কিছুটা দুর্বল ফল করলেও পূর্ণাঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দলটি ভালো ফল করেছে। সমালোচকেরা এর পেছনে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতের অভিযোগ তুলতে পারেন। তবে এটাও সম্ভব যে বড় নির্বাচনগুলোতে ভিন্ন ধরনের ইস্যু প্রাধান্য পায় এবং সেগুলোর রাজনৈতিক সমীকরণও আলাদা।আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘তেলাপোকাদের’ এক সপ্তাহের বিক্ষোভের ঘটনাপ্রবাহ বিজেপি ও মোদির জন্য ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। মোদি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ভবিষ্যতে আন্দোলনকারীরা হয়তো তাকেও ছাড় দেবে না।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে। তবে এ ধরনের রদবদল দলের ভেতরে অসন্তোষও তৈরি করতে পারে। যারা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়বেন, তাদের মধ্যে বিদ্রোহের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আবার প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতাদের মধ্যেও ক্ষোভ জমতে পারে।ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছর উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত মোদি অপেক্ষা করছেন। সেখানে বিজেপি ভালো ফল করবে বলে দলটি আশাবাদী। সেই জয় সমালোচকদের অবস্থান দুর্বল করবে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে। কৌশলটি সফলও হতে পারে।তবে মোদিকে ভারতের ক্ষুব্ধ তরুণদের অসন্তোষও দূর করতে হবে। তাদের বড় একটি সমস্যা কর্মসংস্থান। কিন্তু চাকরির সুযোগ তৈরি করা তো দূরের কথা, সরকার অর্থনীতি পরিচালনায় যথেষ্ট দক্ষ—এমন বিশ্বাস করার মতো কারণও দেখা যাচ্ছে না।সবকিছু বিবেচনায় নিলে মনে হতে পারে, বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির সুসময় হয়তো শেষের দিকে এগোচ্ছে। তবে মোদিকে অবমূল্যায়ন করাও ঠিক হবে না। তিনি হয়তো আবার নিজের শক্তির জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারেন এবং ‘ইন্দিরা গান্ধী সিনড্রোম’—অর্থাৎ ক্ষমতা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা এবং শেষ পর্যন্ত তার নেতিবাচক পরিণতির—ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারেন।
দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত