প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল, ফ্রান্সে অগ্নিসংযোগের সন্দেহে আটক প্রায় ৫০০
ডেক্স রিপোর্ট। ||
রেকর্ড তাপপ্রবাহের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে চলতি গ্রীষ্মে দাবানল সৃষ্টির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে ক্রোয়েশিয়া, জার্মানি, স্পেন, গ্রিস ও যুক্তরাজ্যেও বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও বাড়িঘর পুড়ে গেছে, কোথাও পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পেনে দাবানলের ঝুঁকিতে ঐতিহাসিক নিদর্শন পর্যন্ত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের পরিস্থিতি এখন ‘অত্যন্ত চরম’ অবস্থায় পৌঁছেছে।ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানায়, ১ জুলাই থেকে দেশটিতে দাবানলের ঘটনায় ৪৭৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। আটক ব্যক্তিদের প্রায় ৭০ শতাংশের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর সন্দেহ রয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ রয়েছে।ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে একটি দাবানলে দুই দমকলকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে আটক করা হয়েছে।শুক্রবার ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লঁদ বিভাগের লুগলঁ গ্রাম থেকে ৫২৫ জনের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে দাবানলে প্রায় ১ হাজার ১০০ হেক্টর শুকনো পাইনবন পুড়ে গেছে।আঞ্চলিক কর্মকর্তা জিল ক্লাভরেল সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি এখনো অনুকূলে নয় এবং আগুন ভয়াবহভাবে জ্বলছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৫০০ দমকলকর্মী কাজ করছেন। ছয়টি পানি ছোড়ার বিমানও আগুন নেভানোর কাজে যুক্ত হয়েছে। গ্রামের দিকে যাওয়ার সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।লুগলঁ জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা আরকাশোঁ উপসাগর ও লেজ-ক্যাপ-ফেরের উপদ্বীপ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। জুলাইয়ের শেষ দিকে ওই এলাকায় দুটি বড় দাবানলে ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে যায়। সে সময় প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।তীব্র তাপপ্রবাহে বাড়ছে আগুনের ঝুঁকিতীব্র গরমের মধ্যেই ইউরোপজুড়ে দাবানলের বিস্তার ঘটছে। শুক্রবার ইউরোপের পাঁচজনের মধ্যে তিনজনেরও বেশি মানুষকে অন্তত ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে থাকতে হয়েছে। প্রায় ১৫ কোটি মানুষকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়েছে।বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে মাটি ও জলাধারের পানি। ফলে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। ফ্রান্সে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে হাজারো মানুষের মৃত্যুও হচ্ছে। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ইউরোপের তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক পরিষেবা তাদের সাপ্তাহিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দাবানলের পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত চরম’। দক্ষিণ ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, উত্তর ফ্রান্স এবং দক্ষিণ সুইডেনের কিছু এলাকাতেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুসারে, শুক্রবার পশ্চিম ইউরোপে দিনের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ার পূর্বাভাস ছিল। ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের গড়ের তুলনায় এটি ৮ ডিগ্রি বেশি। পুরো ইউরোপে তাপমাত্রা ওই সময়ের গড়ের চেয়ে ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি বেশি ছিল।জার্মানিতে আগুনের কাছাকাছি গ্রামজার্মানির পশ্চিমাঞ্চলের হুর্টগেন বনে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার ভোরে ২ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেন। আগুন গেই গ্রামের কয়েক শ মিটারের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল।নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী মোনা নয়বাউয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, দাবানলটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। জার্মান সংবাদ সংস্থা ডিপিএ জানিয়েছে, আগুনের মধ্যে গোলাবারুদ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। নিরাপত্তার কারণে দমকলকর্মীদের ওই এলাকায় প্রবেশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেলজিয়াম সীমান্তের কাছের ওই এলাকায় জার্মান সেনাবাহিনীর ট্যাংক ও হেলিকপ্টারও উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে।ক্রোয়েশিয়ার পর্যটন শহরেও আগুনক্রোয়েশিয়ার ডালমাটিয়ান উপকূলে প্রবল বাতাসের কারণে দাবানল রাতারাতি পর্যটন শহর লোকভা রোগোজনিতসার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার বিকেলে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একজনের মরদেহ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।দাবানলের কারণে আশপাশের কয়েকটি শহরে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়। কাছের শহর স্প্লিটে অ্যাম্বুলেন্সে করে ৩৬ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সাতজনের অবস্থা জীবনসংকটাপন্ন ছিল।আঞ্চলিক প্রধান অগ্নিনির্বাপণ কর্মকর্তা স্লাভকো তুকাকোভিচ বলেন, আগুন অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং পথে যা পেয়েছে তা পুড়িয়ে দিয়েছে। এতে ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার সকালে আগুনের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে।তবে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ কাছের ওমিশ শহরে গিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম ভয়াবহ দাবানল। সে সময় তিনি জানান, তখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত হয়নি। এর আগে পুলিশ একজনের মরদেহ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।স্পেনে সরানো হলো রাজাদের দেহাবশেষউত্তর-পূর্ব স্পেনেও দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আগুনের হুমকির কারণে সান হুয়ান দে লা পেনিয়া মঠ থেকে ১১ শতকের আরাগনের তিন রাজার দেহাবশেষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট এগুলো কাছের হুয়েস্কা শহরের একটি জাদুঘরে নিয়ে যায়।সোমবার শুরু হওয়া আগুন বৃহস্পতিবার আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তীব্র গরম ও শক্তিশালী বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত ৯ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। ১৬টি শহর ও গ্রাম থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।দক্ষিণ স্পেনের আরও একটি বড় দাবানলও বৃহস্পতিবার তীব্র হয়ে ওঠে। হুয়েলভা প্রদেশের ওই আগুনে এখন পর্যন্ত ৩১ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। সেখান থেকে প্রায় ৭০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।গ্রিসে সৈকত থেকে সরানো হলো ৫০০ পর্যটকউত্তর গ্রিসের হালকিডিকি উপদ্বীপে বনভূমিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় বৃহস্পতিবার প্রায় ৫০০ পর্যটককে সমুদ্রসৈকত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সিভিরি ও ফোরকা—এই দুই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র আগুনের হুমকির মধ্যে পড়ে। ছোট নৌকার বহর ব্যবহার করে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আগুনের রেখা তৈরি হয়েছিল। আগুনের শিখা ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল। দিনের শেষ দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দমকলকর্মীদের সতর্ক রাখা হয়েছে।দুই দমকলকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় দাবানলের সর্বোচ্চ পাঁচ মাত্রার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।হালকিডিকির ঘন পাইনবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। শুক্রবার সেখানে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬২ মাইল বেগে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার পূর্বাভাস ছিল।যুক্তরাজ্যেও পুড়েছে বাড়িঘরযুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসেও দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে কয়েকটি বাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।আঞ্চলিক ফায়ার সার্ভিসের প্রধান সাইমন টুহিল ঘটনাটিকে তাদের মোকাবিলা করা ‘সবচেয়ে বড় ধরনের’ অগ্নিকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান দাবানলের সঙ্গে তীব্র তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। উচ্চ তাপমাত্রা, শুষ্ক মাটি ও প্রবল বাতাস একসঙ্গে কাজ করায় আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত