প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস সংকটে অচল অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন, ভোগান্তিতে যাত্রী ও চালকরা
স্টাফ রিপোর্টার। ||
দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছেন ভুক্তভোগীরা। গ্যাসের অভাবে সিএনজিচালিত যানবাহনের চলাচলও কমে গেছে। সংকটের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে।গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। দেশের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় কয়েক ঘণ্টা পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অল্প পরিমাণ গ্যাস মিলছে।গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজার ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আনোয়ার হোসেন (৫৪) বলেন, প্রায় চার ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার ভাষ্য, দিনে ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর সুযোগ পান; সেখানে শুধু গ্যাস নিতে চার ঘণ্টা চলে গেলে বাকি ছয় ঘণ্টায় কীভাবে আয় করবেন।হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারগুলো সড়কে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ লাইনটি রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনের অংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় যানবাহনে স্বাভাবিক পরিমাণ গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে অল্প গ্যাস সরবরাহ হলেও তা গাড়িতে দেওয়ার জন্য ফিলিং স্টেশনের প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি চালু রাখতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্টেশন মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বন্ধ সব ফিলিং স্টেশনগ্যাস সংকটের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের সব ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যানবাহন চালকদের দুর্ভোগ বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে এসব ফিলিং স্টেশনে সম্পূর্ণভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল হক জানিয়েছেন, এলএনজি সংকটের কারণে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।নারায়ণগঞ্জে দ্বিগুণের বেশি ভাড়ানারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার-মদনপুর সড়কে কয়েকদিন ধরে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার প্রায় দ্বিগুণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।মদনপুর থেকে আড়াইহাজার যেতে নির্ধারিত ৬০ টাকার পরিবর্তে এখন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে মদনপুর থেকে বিশনন্দী ফেরিঘাটের ৯০ টাকার ভাড়া বেড়ে ২০০ টাকা হয়েছে।বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে যাত্রীদের। এ নিয়ে চালকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডার পাশাপাশি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। গতকাল আড়াইহাজার-মদনপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।যাত্রীদের অভিযোগ, সড়কে সিএনজির পাশাপাশি যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যাও কমে গেছে। বিকল্প যানবাহন না থাকায় বেশি ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।গ্যাস সংকটে বাসাবাড়িতেও ভোগান্তিরাজধানীতে ছুটির দিনেও বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলেনি। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। বেশির ভাগ এলাকাতেই গ্যাসের সংকট দেখা গেছে।বাসাবাড়ির মালিকদের ভাষ্য, গ্যাসের সংকটের কারণে তিতাসের সংযোগ থাকা সত্ত্বেও ভাড়াটিয়াদের চাপের মুখে তাদের এলপিজি লাইন তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে তিতাসের গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সিলিন্ডার গ্যাসও কিনতে হচ্ছে। এতে তাদের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও গ্রাহকরা রান্নার চুলায় গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। জেলা শহরের বাসাবাড়িতে গ্যাসের অভাবে কোথাও মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে, আবার কোথাও সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দুদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবাসিক গ্রাহকদের এমন দুর্ভোগের চিত্র দেখা যাচ্ছে।চট্টগ্রামে সড়ক অবরোধগ্যাস না পেয়ে চট্টগ্রামে সড়ক অবরোধ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। গতকাল সকালে নগরের ষোলশহর এলাকার ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনে সড়কে অবস্থান নেন তারা। এতে মুরাদপুর থেকে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশের অনুরোধে চালকরা সড়ক থেকে সরে যান।চালকদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষা করেও তারা গ্যাস পাচ্ছেন না। কবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে সম্পর্কেও স্টেশন কর্তৃপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারছে না।বিক্ষুব্ধ চালক শাহীন হক বলেন, চট্টগ্রাম শহরের সব ফিলিং স্টেশনেই একই পরিস্থিতি। কোথাও গ্যাস নেই, আবার কোথাও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সারি। কর্তৃপক্ষ সংকটের সমাধান করতে না পারলে তাদের রাস্তায় নামা ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকবে না।ফসিল ফিলিং স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় সিএনজিতে গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদেরও কিছু করার নেই।সিলেটে অবরোধ ও বিক্ষোভগ্যাস সংকটে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি ও ভোগান্তির প্রতিবাদে সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষুব্ধ শ্রমিক ও চালকরা।গতকাল সকালে নগরের শিবগঞ্জ এলাকায় সুরমা অটো কেয়ার পাম্পের সামনে তারা সড়ক অবরোধ করেন। এতে কিছু সময়ের জন্য যানজট সৃষ্টি হয়।এর আগে গ্যাস সংকটের কারণে ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত পাঁচ দিন সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ মালিকদের সংগঠন। শুক্রবার সকাল ৮টার পর স্টেশনগুলো খোলার কথা থাকলেও অনেক পাম্পে গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম ছিল।জালালাবাদ গ্যাস জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের বিতরণ এলাকায় স্বল্প চাপ বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের গ্যাস ব্যবহার ৫০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।সিলেট বিভাগীয় সিএনজি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান বলেন, শুক্রবারের গ্যাস সংকটের মূল কারণ সিএনজি অ্যাসোসিয়েশনের ভুল সিদ্ধান্ত। তার মতে, হঠাৎ করে বিক্রি বন্ধ না করে আগে ঘোষণা দেওয়া হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এরপরও কিছু স্টেশনে গ্যাস বিক্রি করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।পাম্প মালিকদের দাবি, নগরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্টেশন জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে চালু রাখা হলেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস) মো. শোয়েব জানান, মহেশখালী এলাকায় বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট। নিরাপদে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়াতে বাতাসের গতি ২০ নটের নিচে থাকা প্রয়োজন।আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব হবে। এরপর গ্যাস সরবরাহও দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে জানান তিনি।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত