প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
হিন্দুত্ববাদের চেয়ে কর্মসংস্থানই তরুণদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ডেক্স রিপোর্ট। ||
ভারতে জুলাইয়ে ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে টানা এক সপ্তাহের ব্যাপক বিক্ষোভ দেশটির রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব কমে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে শিক্ষা, চাকরি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের এই আন্দোলন দেখিয়েছে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি গত এক যুগে বর্তমান সময়ের মতো এতটা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থায় আর পড়েননি।ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের শাসনাধীন বিহার ও মধ্যপ্রদেশে বিধানসভার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত ওই দুই উপনির্বাচনের একটি আসন ছিল বিজেপির জাতীয় সভাপতির ছেড়ে দেওয়া। প্রায় তিন দশক ধরে আসনটি বিজেপির দখলে ছিল। দলটির এই পরাজয়ের পেছনে ‘জেনারেশন জি’-এর বড় ভূমিকা ছিল।তরুণদের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক এই আন্দোলন ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে শুধু নির্বাচনের ফল দিয়ে এই বিক্ষোভের গুরুত্ব বোঝা সম্ভব নয়। বরং ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, গত এক দশকে বিজেপি যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেছিল, এই আন্দোলন তার ভিতকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ওই রাজনৈতিক বয়ানে নির্বাচনী রাজনীতিতে মোদিকে একজন অপরাজেয় নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।রাজনৈতিক পরিবারের ভেতর থেকেই বিদ্রোহসাম্প্রতিক আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সামাজিক কাঠামো। এর আগে ভারতেও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন হয়েছে। কৃষকদের বছরব্যাপী আন্দোলনের পর সরকার বিতর্কিত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএর বিরুদ্ধেও ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। সেই আন্দোলনের সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতাও ঘটে এবং আন্দোলনের অনেক শীর্ষস্থানীয় সংগঠক বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারাগারে রয়েছেন।আগের আন্দোলনগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী, মতাদর্শ কিংবা সংখ্যালঘুদের কেন্দ্র করে পরিচালিত আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের চরিত্র ভিন্ন। ভারতের শহুরে ও শিক্ষিত তরুণরাই এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একসময় এই জনগোষ্ঠী বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল এবং ‘হিন্দুত্ব’ প্রকল্পের সামাজিক অগ্রদূত হিসেবেও ভূমিকা রেখেছিল।এ কারণে এবারের আন্দোলনকে অনেকাংশেই রাজনৈতিক পরিবারের অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে পরিচিত রাজনৈতিক বয়ান ব্যবহার করে এই আন্দোলনকে উপেক্ষা করা কিংবা দমন করা মোদি সরকারের জন্য আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।হিন্দুত্ববাদী তরুণদের ক্ষোভতরুণদের মধ্যে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বুঝতে হলে গত এক দশকে বিজেপি যে রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে, সেটি বোঝা জরুরি। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে টানা তিনটি পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয় এবং অধিকাংশ রাজ্যের নির্বাচনে আধিপত্য ধরে রাখা নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক সাফল্য।হিন্দু জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ (আরএসএস) এবং তাদের বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে বিজেপি নির্বাচনী প্রচারণাকে একটি নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করেছে। আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তারা হিন্দু জাতীয়তাবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মোদিকে দুর্নীতিমুক্ত ও দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে উপস্থাপনের রাজনৈতিক বয়ানকে একত্র করেছে।বিজেপির এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য মূলত দুটি পরস্পরসম্পূরক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এর একটি ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং অন্যটি ছিল বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি।প্রথম ক্ষেত্রে অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ এবং সংখ্যাগুরুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বয়ানকে আরও শক্তিশালী করা—এসবের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনেক আদর্শিক লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।কিন্তু মোদি সরকারের দ্বিতীয় ভিত্তি—‘সুদিন আসছে’ অর্থাৎ ব্যাপক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি—এখন বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।প্রতীকী রাজনৈতিক সাফল্য কিছু সময়ের জন্য মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা ধরে রাখতে পারে। কিন্তু তা নিশ্চিত কর্মসংস্থান, বাড়তে থাকা আয় এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিকল্প হতে পারে না। যে প্রজন্ম একসময় হিন্দুত্ববাদী ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি’কে উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল, কর্মজীবনে প্রবেশের পর সেই প্রজন্ম সরকারের আদর্শিক লক্ষ্য পূরণের চেয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ দিয়ে সরকারকে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে।এখন তাই প্রশ্ন উঠছে, যে প্রজন্ম একসময় হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের সামাজিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছিল, তারাই কেন এখন মোদির সেই প্রকল্পের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে?প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধানগত দশককে যদি বিজেপির সমর্থকদের দাবি অনুযায়ী যুগান্তকারী অর্থনৈতিক অগ্রগতির সময় ধরা হয়, তাহলে ভারতের তরুণদেরই এর সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হওয়ার কথা ছিল।একটি অর্থনীতিতে প্রকৃত রূপান্তর ঘটলে মাথাপিছু আয় বাড়া, উৎপাদন খাত সম্প্রসারিত হওয়া, কম উৎপাদনশীল কৃষি থেকে শ্রমশক্তির অন্য খাতে স্থানান্তর, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার ও নিরাপত্তা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, শিক্ষিতদের বেকারত্ব হ্রাস এবং প্রবৃদ্ধির সুফল ব্যাপকভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিবর্তন দেখা যাওয়ার কথা।ভারতের অর্থনীতির আকার অবশ্যই বেড়েছে। ২০১৪ সালে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বর্তমানে প্রায় চার ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এটি দীর্ঘদিনের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা, নাটকীয় কোনো উল্লম্ফন নয়। কারণ গড় প্রবৃদ্ধির হার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সরকারের আগের দশকের প্রবৃদ্ধির হারের কাছাকাছি।অন্যদিকে মাথাপিছু জিডিপি এখনো তিন হাজার ডলারের নিচে। দেশের শীর্ষ এক শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় সম্পদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ২২ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত রয়েছে।শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ রয়েছে। ২০০০ সালে ভারতে বিলিয়নিয়ার বা শতকোটি টাকার মালিকের সংখ্যা ছিল ১০-এরও কম। বর্তমানে সেই সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে গেছে।বর্তমানে ভারতে আনুমানিক ৪৩ থেকে ৪৫ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। একই সময়ে ৪৫ কোটির বেশি ভারতীয় এখনো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করছেন। এসব তথ্য দেখায়, দ্রুত সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মোদি সরকারের পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি।ভারতের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে উৎপাদন খাতের অংশ জিডিপির ১৩ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে এবং এই খাত মোট শ্রমশক্তির মাত্র ১১ থেকে ১২ শতাংশের কর্মসংস্থান করছে।তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, অটোমোবাইল, টেলিযোগাযোগ, ইলেকট্রনিক্স ও মহাকাশ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বমানের শিল্প গড়ে তুলেছে। কিন্তু ৬০ কোটির বেশি শ্রমশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এসব খাত এখনো সক্ষম হয়নি।এর ফলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে বেকারদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই শিক্ষিত তরুণ।চীনের সঙ্গে তুলনাএ ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ভারতের তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮০ সালের দিকে প্রায় সমপর্যায়ের মাথাপিছু আয় নিয়ে যাত্রা শুরু করেও চীন ব্যাপক শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।চীন প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করেছে।অন্যদিকে মোদি সরকারের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তব অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সেটিই ভারতের তরুণদের হতাশা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত এবং ক্রমেই শিক্ষিত হয়ে ওঠা প্রজন্মের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট।‘জেনারেশন জেড’-এর নতুন প্রত্যাশা‘জেনারেশন জেড’ এমন এক সময়ে বেড়ে উঠছে, যখন তাৎক্ষণিক যোগাযোগ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা এবং দ্রুত প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রতিশ্রুত সমৃদ্ধির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার মানসিকতা এই প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই কম।তারা সরকারের রাজনৈতিক বৈধতাকে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তিতে বিচার করতে চায়। প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার জন্য যুগের পর যুগ অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য তাদের নেই।তাই বিক্ষোভ বা আন্দোলনের চেয়েও তরুণদের এই অধৈর্য মনোভাবই আগামী দশকে ভারতের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত