প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
একাত্তর ও চব্বিশ—দুটোই বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ
স্টাফ রিপোর্টার। ||
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য হলো, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সরকারের সময় দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার দায়ে যদি মুক্তিযুদ্ধকে ব্যর্থ বলা না হয়, তাহলে জুলাই-পরবর্তী সরকারের ব্যর্থতার দায় কেন জুলাইয়ের ওপর চাপানো হবে?ফারুকীর বক্তব্য নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি যদি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা না হতেন, তাহলে হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে এতটা সমালোচনা তৈরি হতো না। তবে সমালোচনা থাকলেও জুলাইকে প্রামাণ্য করে তুলতে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জুলাই-সংশ্লিষ্ট বহু কাজ তাঁর উদ্যোগেই হয়েছে। সংস্কৃতি উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর ব্যর্থতার তুলনায় সাফল্যের দিকটিই বেশি বলে মনে হয়।কারও সমালোচনা করার সময় কঠোর হওয়া, অথচ তাঁর ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নীরব থাকা যুক্তিসংগত নয়। জুলাই জাদুঘর তার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। ফারুকী সংস্কৃতি উপদেষ্টা থাকার সময় সেখানে সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের নানা অনুষঙ্গ এবং ফেলানীর ভাস্কর্য ছিল। বর্তমানে সেগুলো দেখা যাচ্ছে না। কেন এসব সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এবং ভবিষ্যতেও উঠবে।এবার বর্তমান সরকারের ভারতনীতি প্রসঙ্গে আসা যাক। দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বলা যায়, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে আধিপত্যবিরোধী অবস্থান রয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং শহীদ হাদির হত্যাকারীদের হস্তান্তরের বিষয়টি সরাসরি তুলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি নির্ধারণ করে দিয়েছে।এ নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও ভারত ছাড়া বাংলাদেশের চলবে না—এমন ধারণার সরল জবাব হলো, ভারত থেকে পাঠানো নিম্নমানের চাল বাংলাদেশ গ্রহণ না করে ফেরত দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের চালের সংকট তৈরি হয়নি। বরং এ ঘটনা ভারতের জন্য সমস্যার কারণ হয়েছে।ভারতের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নিম্নমানের চাল পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিল, মান যাচাই না করেই কেন নিম্নমানের চাল পাঠানো হলো। ওই আলোচনায় এমন কথাও বলা হয়েছে যে, এ ঘটনায় ভারত অপমানিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির দায় ভারতের দুর্নীতিবাজদের।গত দুই দশকে ভারতের দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজদের যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তার মাধ্যমে নিম্নমানের চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডাল ও মসলাসহ বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা হয়েছে। লেখকের দাবি, সেই সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়।বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে আগের সরকারের সময়কার স্বামী-স্ত্রীর মতো ঘনিষ্ঠ অবস্থায় নেই, তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। আপাতত দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা রয়েছে—এটুকু বলা যায়। একই সঙ্গে বর্তমান সময়কে দরকষাকষির পর্যায় হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এই পর্ব শেষ হলে দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় এখনই চূড়ান্ত উপসংহারে পৌঁছানো ঠিক হবে না। শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্স নিয়েও অনেকে আলোচনা করছেন। পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে কেন দিল্লিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, সেই বিষয়টির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। লেখকের মতে, এ ধরনের তুলনা খুবই সরলীকৃত।ভারতের প্রভাবশালী কূটনীতিক রিভা গাঙ্গুলি দাসও ডয়চে ভেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন। লেখকের ব্যাখ্যায়, ভারত শেখ হাসিনাকে বন্ধু এবং খালেদা জিয়াকে বিরোধী হিসেবে দেখেছে—এই সমীকরণ বহুদিনের। খালেদা জিয়াও একসময় বলেছিলেন, ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।’লেখক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অনুজের প্রশ্নের জবাবে লিখেছিলেন, ভারত সম্ভবত শেখ হাসিনার বিকল্প কাউকে খুঁজছে। অর্থাৎ হাসিনার স্থলাভিষিক্ত একজনকে। সেই ব্যক্তি বা বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক ভালো হবে না—এটাই তাঁর বক্তব্যের সারকথা।আবার জুলাই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। একজন শিল্পী এমন একটি গ্রাফিতি এঁকেছেন, যেখানে একাত্তর ও চব্বিশকে দাঁড়িপাল্লায় তুলনা করা হয়েছে। সেখানে চব্বিশকে তুলনামূলকভাবে ভারী দেখানো হয়েছে। আবার রঙের ব্যবহারে একাত্তরকে লাল এবং চব্বিশকে কালচে রঙে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখকের ব্যাখ্যায়, এর মাধ্যমে চব্বিশকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এবং একাত্তরের তুলনায় চব্বিশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে।কেউ সরাসরি না বললেও একাত্তর ও চব্বিশকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সমাজে বিভাজন তৈরি করতে পারে। লেখকের মতে, আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগীরা এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে জাতিকে আবারও বিভক্ত করতে চায়।একাত্তর ও চব্বিশকে যারা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন, লেখকের দৃষ্টিতে তারা জুলাইয়ের বিরোধী শক্তি এবং গণতন্ত্রের আড়ালে থাকা ফ্যাসিস্ট শক্তির অংশ। তবে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জেনারেশন জেড ও আলফা। জেন-জি ইতোমধ্যেই দেশের নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতে আলফাও নেতৃত্বে আসবে। তাই বিভাজনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন মানুষকে আলাদা রেখে অর্থ ও ক্ষমতার সুবিধা নেওয়ার চিন্তা সফল হবে না।সবশেষে বলা যায়, বারবার আমাদের বিভক্ত হওয়ার পেছনে ভুল চিন্তার ভূমিকা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থ ও ক্ষমতার লোভ। এই লোভই অনেক সময় ভুল চিন্তার পরিবেশ তৈরি করে। একাত্তর বাংলাদেশের ভিত্তি, আর চব্বিশ তার নিজস্বতা ও অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত—এই দুই অধ্যায়কে মুখোমুখি না দাঁড় করিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখাই মূল বক্তব্য।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত