প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
এমআরটি লাইন-১ ও ৫-এর নির্মাণ ব্যয় বাড়তে পারে দ্বিগুণেরও বেশি
স্টাফ রিপোর্টার। ||
ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, করের হার বাড়া এবং নকশায় পরিবর্তনের কারণে ঢাকার মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫-এর নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। সরকারের গঠিত সাত সদস্যের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় আরও বেশি ধরা হয়েছে।মে মাসে গঠিত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া জানান, পাঁচ থেকে সাত বছর আগে প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময়ের তুলনায় বর্তমানে নির্মাণসামগ্রীসহ অন্যান্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কমিটি ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়েছে। একই সঙ্গে টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে এবং করের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক বসুনিয়া বলেন, বর্তমান ও প্রস্তাবিত নকশার ওপর ভিত্তি করে কমিটি অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। এটি কোনো প্রকৌশলগত সমীক্ষা ছিল না। ওই বিশ্লেষণে প্রকল্প দুটির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি কয়েকটি স্টেশনের নকশায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণ ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫-এর ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮৮ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।বসুনিয়া বলেন, তাদের করা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ যথাযথ। বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় ভারতসহ অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ভারতের প্রকল্পগুলোতে ডিজেল, লোহা, সিমেন্ট ও পাথরের মতো অনেক নির্মাণসামগ্রী স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এসব পণ্যের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। তাই ভারতের সঙ্গে সরাসরি নির্মাণ ব্যয়ের তুলনা করা যুক্তিসংগত নয়।চলতি মাসের শুরুতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।ডিএমটিসিএলের সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় আরও বেশিস্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রাক্কলনের তুলনায় আরও বেশি ব্যয় ধরে এমআরটি লাইন-১ ও ৫-এর সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করেছে ডিএমটিসিএল। প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাবটি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানোর পর গত সপ্তাহে তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।সংশোধিত প্রস্তাবে এমআরটি লাইন-১-এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের অর্থায়ন থাকবে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। মূল প্রস্তাবে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা এবং জাপানের ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।প্রকল্পটির মূল বাস্তবায়নকাল ছিল সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। সংশোধিত প্রস্তাবে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫-এর সংশোধিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানি অর্থায়নের পরিমাণ ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। মূল প্রস্তাবে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা এবং জাপানের ঋণ ছিল ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।লাইন-৫ প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল জুলাই ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত। সংশোধিত প্রস্তাবে বাস্তবায়নকাল বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভায় ব্যয়ের বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের পর ডিএমটিসিএলের সংশোধিত প্রস্তাবের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।ব্যয় কমাতে জাপানের সঙ্গে আলোচনাদরপত্র জমা দেওয়ার পর বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমআরটি লাইন-১ ও ৫-এর বাস্তবায়ন কার্যত থেমে যায়। ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে সে সময় অর্থ উপদেষ্টা, পরিকল্পনা উপদেষ্টাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জাপান সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন।তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ব্যয় কমানোর বিষয়ে আলোচনার জন্য জাপান সফরও করেন। তবে জাপানের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্প দুটির কাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রকল্প দুটির কাজ পুনরায় শুরুর জন্য যতটা সম্ভব ব্যয় কমিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দেন তিনি।স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হলে সরকারকে দ্রুত প্রকল্প দুটির কাজ শুরু করা প্রয়োজন। কারণ বর্তমানে জাপান যে সুদের হার দিচ্ছে, ভবিষ্যতে তা নাও পাওয়া যেতে পারে।জাপান প্রকল্প দুটির জন্য শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ সুদের হার প্রস্তাব করেছে। বসুনিয়া জানান, গত কয়েক বছরে জাপান বিশ্বজুড়ে সুদের হার বাড়ালেও এই দুই মেট্রোরেল প্রকল্পের ক্ষেত্রে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে।তিনি বলেন, প্রকল্প দুটি বাতিল করে অন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে নতুন করে শুরু করা হলে এত কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে।ইতিমধ্যে ব্যয় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশিগত বছরের জুন পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে ৩ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পে ৫ হাজার ১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ, দুই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত