প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
আয়নায়ঘরে ঝুলিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ছাত্রদল নেতা নূরে আলমের
স্টাফ রিপোর্টার। ||
২০১৬ সালে গভীর রাতে সাদাপোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি ছাত্রদল নেতা নূরে আলমকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে প্রথমে ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘর এবং পরে র্যাবের আয়নাঘরে গুম করে রাখা হয় বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তিনি। সেখানে তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ করেন নূরে আলম।গুমের পর নির্যাতন এবং পরে মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকায় তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এর ফলে তার শিক্ষাজীবনও থেমে যায়।মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে ডিজিএফআইয়ের গোপন বন্দিশালা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দি দেন নূরে আলম। এর আগে ১২ আগস্ট মামলায় প্রথম দিনের জবানবন্দি দেন তিনি।জবানবন্দিতে নূরে আলম জানান, ২০১৬ সালে তিনি নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। নিয়মিত বিএনপির বিভিন্ন মিছিল ও কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ফেসবুকে বিএনপির পক্ষে এবং আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন।তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে ৩৫ থেকে ৪০ জন সাদাপোশাকের ব্যক্তি তার বাড়িতে গিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়। হ্যান্ডকাফ ও জামটুপি পরিয়ে গাড়িতে তোলার পর প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা যাত্রা শেষে তাকে একটি ৮ ফুট বাই ১১ ফুট সেলে রাখা হয়। সেলটির দরজা ছিল দুই স্তরের। ভেতরে লোহার শিক ও কাঠের দরজা ছিল। সেখানে একটি এক্সজস্ট ফ্যান ও সার্বক্ষণিক জ্বালানো বৈদ্যুতিক বাল্ব ছিল।নূরে আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, সেলের দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের লেখা ছিল। এর মধ্যে ‘হে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করো’ এবং ‘আল্লাহ জালিমদের সাহায্য করেন না’—এ ধরনের লেখাও তিনি দেখতে পান। একদিন মাইকে একজনের মৃত্যুর খবর প্রচারের সময় ‘পূর্ব কাফরুল নিবাসী’ কথাটি শুনে তিনি ধারণা করেন, তাকে পূর্ব কাফরুলের আশপাশের কোনো ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় রাখা হয়েছে। সেখানে ভোরে ট্রেন এবং দিনের বেলায় বিমান চলাচলের শব্দও শুনতেন বলে জানান তিনি।জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, প্রথম দিন বিকেলে দুজন ব্যক্তি তার সেলে প্রবেশ করেন। তারা তার নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং ফেসবুকের পাসওয়ার্ড জানতে চান। বিএনপির রাজনীতি করা এবং শেখ হাসিনা সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণও জানতে চাওয়া হয়।তিনি জানান, তাকে তুলে আনার কারণ জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ভয়ভীতি দেখান। এরপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পরিচিত ব্যক্তিদের নাম জানতে চাওয়া হয় এবং তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এক নারী কর্মকর্তাও তাকে একই ধরনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এক পর্যায়ে তাকে ঝুলিয়ে রেখে মারধর করা হয় বলেও জবানবন্দিতে অভিযোগ করেন তিনি।নূরে আলম জানান, প্রায় ১৪ থেকে ১৫ দিন ওই সেলে রাখার পর তাকে অন্য একটি সেলে নেওয়া হয়। সেখানে আরও চারজন ব্যক্তিকে দেখতে পান তিনি। প্রায় ১২ ফুট বাই ১৩ ফুট আয়তনের ওই সেলে তাকে আনুমানিক ৪০ দিন রাখা হয় বলে জানান তিনি।তার অভিযোগ, সেখানে কথা বলার কারণে তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হতো। দীর্ঘ সময় হ্যান্ডকাফ ও চোখ বাঁধা অবস্থায় রাখার কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাতে ও কানে ক্ষত তৈরি হয়। চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। গোসল, দাঁত ব্রাশ, টয়লেট ও ওজুর জন্য সর্বোচ্চ দুই মিনিট সময় দেওয়া হতো বলে জানান নূরে আলম।জবানবন্দিতে তিনি তাজুল ইসলাম, রাজিব, ডাক্তার ইকবাল ও রাকিব নামে আরও কয়েকজনের সেখানে থাকার কথা উল্লেখ করেন। খাবার খাওয়ার সময় স্ট্যান্ড ফ্যানের পাদানিতে ‘র্যাব-৪’ লেখা দেখতে পান বলে জানান তিনি। এ থেকেই তাকে র্যাব-৪-এ গুম করে রাখা হয়েছে বলে তার ধারণা হয়।নূরে আলম আরও জানান, একপর্যায়ে তাদের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে, চোখ ও মাথা ঢেকে গাড়িতে করে প্রায় দেড় ঘণ্টা নিয়ে একটি সেলে রাখা হয়। তিনি এটিকে র্যাব-১০ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা গাড়িতে নেওয়ার পর তাকে আরও একটি সংকীর্ণ সেলে রাখা হয়।সেখানে তিনি কথা বলে জানতে পারেন, তার পাশে আবুজর, নাজিম উদ্দিন, তাজুল ইসলাম ও সামি নামে আরও কয়েকজন ছিলেন।জবানবন্দিতে নূরে আলম অভিযোগ করেন, একদিন তাকে গাড়িতে করে একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে র্যাবের গাড়ি ও সাইরেন ব্যবহার করে এবং বিভিন্নভাবে পরিস্থিতি তৈরি করে কয়েক ঘণ্টা ধরে একটি মিথ্যা জঙ্গি উদ্ধারের অভিযান সাজানো হয়।তার ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাবের সদস্যরা বাইরে থেকে দরজা ভাঙার অভিনয় করেন। বাইরে থেকে সাংবাদিক ভিডিও করার সময় ভেতরে থাকা র্যাব সদস্যরা জানালা বন্ধ করে দেন। পরে একটি ল্যাপটপে আগুন দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়।এরপর চট্টগ্রাম র্যাব-৭-এর প্রধান কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ সেখানে আসেন। তিনি তাদের চোখ খুলে দিতে বলেন। চোখ খোলার পর সেখানে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ, বলবেয়ারিং, তার, গুনা, পেরেক ও বই দেখতে পান বলে জানান নূরে আলম। এসব সামগ্রীর তালিকা তৈরি ও সেগুলো নির্দিষ্টভাবে সাজানোর নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও তিনি জানান।নূরে আলমের দাবি, এভাবেই তাদের নিয়ে একটি মিথ্যা জঙ্গি অভিযানের নাটক সাজানো হয়। পরে তাদের আকবর শাহ থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং পুলিশ আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠায়।র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদের সময় এএসপি রুহুল আমিন তাকে বলেন, ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা তাকে বাড়ি থেকে তুলে এনেছিল এবং প্রথমে যে স্থানে রাখা হয়েছিল সেটি ডিজিএফআইয়ের, পরেরটি টিএফআইয়ের জায়গা ছিল—জবানবন্দিতে এমন তথ্যও দেন নূরে আলম।তিনি জানান, এরপর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। মিথ্যা মামলায় প্রায় ১১ মাস কারাভোগের পর উচ্চ আদালতের আদেশে তিনি জামিনে মুক্ত হন।নূরে আলম তার গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকীসহ ডিজিএফআই ও র্যাবের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করেন। জড়িতদের শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন তিনি।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত