প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি, ব্যাহত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা
স্টাফ রিপোর্টার। ||
রাজধানী ঢাকার পাশের গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী গ্রামের বাসিন্দা ছোয়াইদ হাসান নুজাইম। স্থানীয় বরমী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর জন্য দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎহীন থাকা এখন স্বাভাবিক ঘটনা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কখন ফিরবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে বাড়িতে পড়তে বসার সময় যেমন বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকতে হয়, তেমনি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও স্বস্তির বাতাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।নুজাইমের ভাষ্য, দিন-রাতের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে বাসায় ঠিকমতো পড়তে পারে না। আবার বিদ্যালয়েও অতিরিক্ত গরমে ফ্যান বন্ধ থাকায় ঘেমে যায় এবং পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।শুধু নুজাইম নয়, বরমী ইউনিয়ন ও আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তীব্র গরমে শ্রেণিকক্ষে ফ্যান থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেগুলো অচল হয়ে পড়ে। কেউ খাতা দিয়ে বাতাস করে, কেউ বারবার পানি পান করে, আবার কেউ বন্ধ ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফলে শিক্ষকরা পাঠদান চালিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগের বড় অংশ গরম ও বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় আটকে থাকে।দিনের পাশাপাশি রাতের লোডশেডিংও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নতুন সংকট তৈরি করছে। স্থানীয় আরেকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ জানায়, রাতে পড়তে বসার সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়। বাড়িতে বিকল্প আলোর ব্যবস্থা থাকলেও প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বই নিয়ে বসে থাকা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটে। ফলে সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত লাগে।আহাদ বলে, রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে ঘুমাতে কষ্ট হয় এবং পড়াশোনাও করা যায় না। সকালে স্কুলে গেলে ঘুম ঘুম লাগে, ফলে ক্লাসে মনোযোগ দিতে আরও সমস্যা হয়।নুজাইম ও আহাদের মতো দেশের বিভিন্ন মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থীরও একই অভিজ্ঞতা। দিনের লোডশেডিংয়ে শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, আর রাতের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে নষ্ট হচ্ছে পড়াশোনা ও ঘুমের সময়। স্কুলের ক্লাস, বাড়ির কাজ, পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা পরদিনের পড়া—সব ক্ষেত্রেই ছন্দপতন ঘটছে। কখন বিদ্যুৎ থাকবে বা যাবে, সেই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট পড়াশোনার রুটিনও ধরে রাখতে পারছে না।এই পরিস্থিতির পেছনে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্বেগজনক চিত্রও উঠে এসেছে। চলতি বছরের শেষ শ্রাবণে এসে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ আগস্ট দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালের একই দিনের তুলনায় দুই বছরে এই পরিমাণ প্রায় ১৮ গুণ বেশি। আর ২০২২ সালের ৫৫ মেগাওয়াটের তুলনায় পাঁচ বছরে লোডশেডিং বেড়েছে প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ গুণ।পিডিবি সারাদিনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার ভিত্তিতে গড় লোডশেডিংয়ের হিসাব দেয়। অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, চাহিদা ও ঘাটতির তথ্য প্রকাশ করে। পিজিসিবির তথ্যেও নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির বড় চিত্র পাওয়া গেছে।গত ১০ আগস্ট রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। চলতি ১৬ আগস্টের বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাসেও ঘাটতির আশঙ্কা ছিল। পিজিসিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ওই দিন দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৫ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াট ধরা হয়েছিল। এর আগের দিন ১৫ আগস্ট প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৯১ মেগাওয়াট, বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৯০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।উৎপাদন ও চাহিদার এই ব্যবধানের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরাই বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরের ফ্যানের পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষের ফ্যানও বন্ধ থাকে। এতে স্বাভাবিক বাতাস চলাচল ব্যাহত হয়।শিক্ষার্থীরা জানায়, দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে শ্রেণিকক্ষে বসে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে শরীর দুর্বল হয়ে আসে। তখন শিক্ষকের পাঠের বদলে কখন বিদ্যুৎ আসবে বা কখন একটু বাতাস পাওয়া যাবে, সেদিকেই মনোযোগ চলে যায়। ফলে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থেকেও তারা কতটা পাঠ গ্রহণ করতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।শিক্ষকরাও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, গরমে ফ্যান বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়। ফলে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক অস্বস্তির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রচণ্ড গরম। এর মধ্যে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে মনোযোগী রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফ্যান বন্ধ থাকায় তারা ঘেমে যায় ও অস্বস্তিতে থাকে। পাঠদান চালিয়ে গেলেও তাদের মনোযোগের বড় অংশ গরম ও বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় থাকে। ছোট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি দেখা যায়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বলেন, দিনের লোডশেডিংয়ে ক্লাসে মনোযোগ কমার পাশাপাশি রাতের বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুমেও প্রভাব ফেলছে। অনেকেই রাতে পড়তে পারছে না, আবার গরমের কারণে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছে না। ফলে পরদিন বিদ্যালয়ে এসে তারা ক্লান্ত থাকে এবং পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ও ফলাফলেও প্রভাব পড়তে পারে।মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেন ওই শিক্ষক।এ অবস্থায় অভিভাবকরাও উদ্বিগ্ন। তাদের ভাষ্য, সন্তানদের পড়তে বসালেও বিদ্যুৎ না থাকায় তারা পড়াশোনা করতে পারছে না। রাতে ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ায় সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময়ও ক্লান্ত থাকে।লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়ার অভ্যাসেও প্রভাব ফেলছে।এনামুল হাসান নামের এক অভিভাবক বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় লোডশেডিংয়ের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কখন বিদ্যুৎ আসবে, সেটিও অনিশ্চিত। সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে এ কারণে তারা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। রাতে পড়তে পারে না, আবার গরমে ঘুমাতেও পারে না।তিনি আরও বলেন, এখন বিদ্যুৎ এলেও স্বস্তি নেই, কখন চলে যাবে সেই চিন্তা থাকে। আইপিএস থাকলেও ঠিকমতো চার্জ দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না। সন্তান পড়তে বসলে বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার রাতে ঘুমের সময়ও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেই হবে, বিকল্প নেই: অধ্যাপক শামসুল আলমদেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট দূর করতে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার যে ভর্তুকি দিচ্ছে, সেটিও অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কারণ সাধারণ মানুষের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।তিনি আরও বলেন, সামর্থ্যবানরা ক্যাপটিভ বা ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারেন। গুলশান, ধানমন্ডি ও বারিধারার মতো এলাকার অনেকেরই এ ধরনের ব্যবস্থা করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু দেশের বড় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের সেই সামর্থ্য নেই। তাদের কাছে বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়, প্রয়োজনীয় সেবা। তাই তাদের চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: বাংলাধারা/ডেস্ক
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত