প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে ট্রাম্পের উদ্যোগ, চীন-রাশিয়ার বাধার আশঙ্কা
ডেক্স রিপোর্ট। ||
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন করে চাপ প্রয়োগ শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা বা ‘লাইফলাইন’ দেবে—এমন যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে আর্থিক শাস্তির হুমকি দিয়েছেন তিনি। তেহরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ অভিযানের অংশ হিসেবেই এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প।যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ব্যয়বহুল সংঘাত শুরুর ছয় মাসের মাথায় ট্রাম্পের নতুন এই উদ্যোগ সামনে এলো। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ধারাবাহিক বাণিজ্যযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছেন তিনি।তবে ইরানের দুই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাশিয়া এরই মধ্যে ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে দেশটি অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হচ্ছে।চীনও নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রয়োজন হলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার নজির একাধিকবার রেখেছে।কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সরকারের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল–জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই চাপের অভিযান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা ‘খুবই কঠিন’ হতে পারে।তার মতে, ট্রাম্প এককভাবে এমন একটি সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা কার্যকর করতে চাইছেন, যা সাধারণত বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। এ ক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।‘ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিণতি’র হুঁশিয়ারিমঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার অভিযান হবে ‘যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’।মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানকে সহায়তা করা দেশগুলোকে ‘ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, নগদ অর্থ দেওয়া, মানি এক্সচেঞ্জ, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানকে সহযোগিতার বিষয়গুলোও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।তিনি বলেন, ‘এসব এখনই বন্ধ করতে হবে।’এর আগে একই দিন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইরান ইউএইর ওপর নির্ভরশীল ছিল।ইউএইর অভিযোগ, ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবির ধারণা, ইউএইকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাষ্ট্র ‘জোরালোভাবে উৎসাহিত বা প্রভাবিত’ করেছে। ইরানের অন্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও ওয়াশিংটন চাপ বাড়াতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এ তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ চীন।চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিনচীন-ইরান বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশই চীন কিনেছে। তবে চীনের তেল শোধনাগারগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করা সহজ হবে না। কারণ দেশটির অধিকাংশ শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম।ইরানের অর্থনৈতিক লেনদেন প্রক্রিয়াজাত করলে চীনের বড় ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে চীনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে স্পর্শকাতর কূটনৈতিক সময়ে এমন পদক্ষেপ বেইজিংকে পাল্টা ব্যবস্থা নিতেও উৎসাহিত করতে পারে।চীন ও এশিয়া-প্যাসিফিকবিষয়ক গবেষক ইউ জি বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে ট্রাম্পের দেওয়া হুমকির কারণে চীনের সঙ্গে ইরানের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা সম্পৃক্ততায় পরিবর্তন আসবে না।তার ভাষ্য, ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী। একই সময়ে বেইজিংও ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়।পল মাসগ্রেভের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী’ গৌণ নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক শীতল যুদ্ধের’ মধ্যে থাকায় ট্রাম্প সম্ভবত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবেন না।ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।তার মতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন।চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আগামী মাসে ওয়াশিংটন সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কম রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।ইউ জি বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আরও দুটি বৈঠকে উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এটি আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে না।রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের বিকল্প সম্পর্করাশিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা আলাদা। চীনের তুলনায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ কম হলেও কয়েক বছর ধরে মস্কো ও তেহরান পশ্চিমা ব্যবস্থার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা দুই দেশ ২০ বছরের একটি অংশীদারত্ব চুক্তিতে সই করে। রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই তসিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন তেলের পাশাপাশি ক্যাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের খবরও রয়েছে।সোমবার এনবিসি নিউজ একটি ইউরোপীয় সরকারের নথির বরাত দিয়ে জানায়, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ‘ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি’ পাঠিয়েছে।রাশিয়ার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়াইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক অভিযানের সমালোচনা করেন। তিনি এটিকে ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন।তার দাবি, এই নীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরো পরাজয়’ ডেকে আনবে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরাগচি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সন্ত্রাস বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।’ইরান রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে গঠিত ব্রিকসের সদস্য। পশ্চিমা বাজারের বাইরে নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ইরান এই জোটকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জানান, ইরান ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।তিনি আরও বলেন, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে বলে ইরান মনে করে। তেহরান ব্রিকসের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় মুদ্রা সহযোগিতার বিষয়ও বিবেচনা করছে।তবে ইরানের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে এনডিবি এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। সদস্য হতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে ইরানকে।তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি বলেন, ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে।আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে আছেন, যা তিনি জিততে পারবেন না এবং যেখান থেকে বেরও হতে পারছেন না।’
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত