প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
স্টাফ রিপোর্টার। ||
ভারত সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মাদক চোরাচালান বন্ধ হয়নি। বরং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ অবৈধ কারবারের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সীমান্তঘেঁষা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লায় অনুসন্ধানে মাদক পাচারের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়া গেছে।লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সীমান্তসংলগ্ন সড়কের বিভিন্ন গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটিতে লেখা রয়েছে—‘মাদককে না বলুন—এমপি বাবুল’। তবে গত ১৪ এপ্রিল ওই এলাকার সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুলের ভাতিজা ইলিয়াছ হোসেন ওরফে লিটনকে র্যাব আটক করে। তার বাড়ির গোয়ালঘর থেকে ভারত থেকে আসা কোডিনযুক্ত নিষিদ্ধ সিরাপ ‘এসকাফ’ উদ্ধার করা হয়।এ বিষয়ে এমপি বাবুল ১৯ আগস্ট বলেন, প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রে তার ভাতিজাকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। পরে র্যাব বিষয়টি জানতে পেরে আর বাড়াবাড়ি করেনি বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, একটি বিশেষ মহল তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং বিষয়টি সরেজমিন যাচাই করা যেতে পারে।লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা ঘুরে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের প্রবণতা কমেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে যারা আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের আশ্রয়ে কারবার চালাতেন, তাদের একটি অংশ এখন নতুন রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মাদক পাচারে এখন নানা ধরনের জটিল কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। নারী ও শিশুদের বাহক হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে লেনদেনে হুন্ডি ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহারও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।১২ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৫টি সীমান্ত পয়েন্টে অনুসন্ধান চালান সংবাদপত্রটির প্রতিনিধিরা। তারা দুই সংসদ সদস্য, বিজিবি ও পুলিশের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাংবাদিক, আইনজীবী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সাবেক প্রায় ১০ জন মাদক কারবারির সঙ্গে কথা বলেন। বিভিন্ন মামলার নথি পর্যালোচনা করেও মাদক জব্দ, গ্রেপ্তার এবং পরে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে।বালারহাটে মাদকের বড় আস্তানার অভিযোগকুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট পূর্ব ফুলমতি এলাকায় একটি সীমান্তঘেঁষা বাড়িকে ঘিরে মাদক কারবারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভারত থেকে আসা বড় চালানের একটি অংশ সেখানে আসে এবং বাড়ির মালিক সাজু মিয়া এ কারবারের সঙ্গে জড়িত।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাজু মিয়ার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিলেন ফুলবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী। প্রায় ১৭ বছর ধরে ওই এলাকায় মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। জুলাই বিপ্লবের পর তিনি আত্মগোপনে গেলেও কারবার বন্ধ হয়নি।স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সাজু মিয়া আবারও সক্রিয়। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী তাকে আশ্রয় দিচ্ছেন বলেও তারা দাবি করেন।স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গাঁজা প্রবেশ করে। পাশাপাশি ইয়াবা, ফেনসিডিল ও মদের চালানও আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারবারের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বর্তমানে বড় বাড়ি, তেলের পাম্প ও মার্কেটের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান।পুরোনো সীমান্তপথে নতুন নিয়ন্ত্রণলালমনিরহাটের সঙ্গে ভারতের প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। বিজিবির নজরদারি সত্ত্বেও জেলার বিভিন্ন সীমান্তপথে ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ ও ইয়াবা প্রবেশ করছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। কালীগঞ্জের গোড়ল ও চন্দ্রপুর ইউনিয়নে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে স্থানীয়দের দাবি।কালীগঞ্জের মুন্সির বাজার রোডের জাকিরুল ইসলাম ওরফে জাকেরকে স্থানীয়রা মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছেন। তিনি সাবেক ইউপি সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়ার ভাই এবং সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।কুড়িগ্রামে বিপুল মাদক জব্দমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কুড়িগ্রামে বিভিন্ন অভিযানে প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।এই সময়ে ১২১ কেজি গাঁজা, ৬ হাজার ৮১১ পিস ইয়াবা, ১ হাজার ৬ বোতল ফেনসিডিল, ২২০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট এবং ১৪ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় ১৭৮টি মামলা হয়েছে এবং ১৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।লালমনিরহাটেও চলতি বছরে একাধিক বড় মাদকের চালান আটক হয়েছে। ১৫ আগস্ট বিজিবি-১৫ ব্যাটালিয়নের অভিযানে প্রায় ২১ লাখ টাকা মূল্যের ৭ হাজার ইয়াবা জব্দ করা হয়।রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকেও মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লায়ও থামেনি চোরাচালানব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলায় প্রায় ৭৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। বিজিবির নজরদারি থাকলেও মাদক চোরাচালান বন্ধ হয়নি। মহাসড়কের বিভিন্ন চেকপোস্টে কিছু চালান আটক হলেও বড় অংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।সরাইল ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার করা মাদকের মোট মূল্য ছয় কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ এক কোটি ৯ লাখ টাকার মাদক জব্দ করা হয়।ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, অপরাধীরা শক্তিশালী হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের জন্য কঠিন। তিনি জানান, পুলিশের যানবাহন সংকট ও মনোবল কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিজয়নগরে আরও দুটি পুলিশ ফাঁড়ি এবং জনবল বাড়ানোর বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ আব্দুর রউফ জানান, মাদক কারবারিদের বড় একটি চক্র সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুলিশের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে তাদের কিছু নজরদারি সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।জেলা জজ আদালতের পিপি ফখর উদ্দিন আহম্মদ খান বলেন, ছোট কারবারিরা স্থানীয় আদালত থেকে সহজে জামিন না পেলেও বড় আসামিদের অনেকে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তার ভাষ্য, ধরা পড়া অনেকেই সামান্য অর্থের বিনিময়ে বাহক হিসেবে কাজ করেন, মূল কারবারিরা সাধারণত চালানের সঙ্গে থাকেন না।কুমিল্লার প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকাতেও মাদক প্রবেশের একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে। বিজিবির রিজিওন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী জানান, গত তিন বছরে কুমিল্লায় ২০ হাজার ২০০টি অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫২ কোটি টাকার মাদক জব্দ করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৫২৬ জনকে হাতেনাতে আটক করা হয় এবং আড়াই শতাধিক আসামি পলাতক রয়েছে।কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সেখানে মাদক তুলনামূলক সহজলভ্য। পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। ১৭ আগস্ট তিন লাখ ইয়াবাসহ দুই কারবারিকে গ্রেপ্তার করাকে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।সাবেক কাউন্সিলর কাজী গোলাম কিবরিয়া অভিযোগ করেন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে কুমিল্লায় মাদক কারবার বেড়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন একটি চক্র এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।সীমান্তের বিভিন্ন পথ ব্যবহারঅনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত থেকে মাদক প্রবেশের ক্ষেত্রে দুর্গম সীমান্ত এলাকা, নদীপথ এবং কাঁটাতারের বেড়ার আশপাশের বিভিন্ন স্থান ব্যবহার করা হচ্ছে। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টকে চোরাচালানের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।কুড়িগ্রামের নাওডাঙ্গা, বালারহাট, কাশিপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। রৌমারী ও রাজীবপুরের সীমান্তপথ দিয়েও মাদক দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগরের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকেও মাদক দেশের অভ্যন্তরে চলে যাচ্ছে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া, বুড়িচং, আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ ও চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টকেও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।নজরদারি এড়াতে নানা কৌশলআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে মাদক কারবারিরা নানা কৌশল ব্যবহার করছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সীমান্ত, নদীপথ ও বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে মাদক পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে।মাদক পরিবহনে ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। নারী ও শিশুদেরও বাহক হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহকদের অনেককে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। তারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক পৌঁছে দেয়।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সক্রিয় সিন্ডিকেটরাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মাদক কারবার বন্ধ না হয়ে বরং এর নিয়ন্ত্রণে নতুন গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধেও যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।মাদক ব্যবসার অর্থ লেনদেনে হুন্ডি, বেনামি ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কারণে মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগির অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের কাছেও এর সুবিধা পৌঁছায় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।সূত্র: আমার দেশ