প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
যেভাবে পশ্চিম তীরকে নতুন রূপ দেওয়ার পথে এগোচ্ছে ইসরায়েল
ডেক্স রিপোর্ট। ||
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের নতুন উদ্যোগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।গত সেপ্টেম্বরে পশ্চিম তীরের একটি ইসরায়েলি বসতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। এই জায়গাটি আমাদের।’ ওই অনুষ্ঠানে জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত ‘ই১’ এলাকায় বসতি সম্প্রসারণ এগিয়ে নিতে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তিনি। সম্প্রতি সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০টি নতুন বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ই১ এলাকাটি। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল এই এলাকায় বড় আকারের বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে বিরত ছিল। নতুন উদ্যোগটির সমালোচনা করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ।জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘অস্তিত্বের সংকট’ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও কানাডা যৌথ বিবৃতিতে ই১ এলাকায় বসতি নির্মাণের পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে পশ্চিম তীরে ভৌগোলিক বিভাজন তৈরি হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস পরিকল্পনাটি বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা ও গোলান মালভূমি দখল করে। এরপর থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।অধিকৃত এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হলেও কয়েক দশকে পশ্চিম তীরে এসব বসতির সংখ্যা বেড়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল সেখানে প্রায় ১৬০টি বসতি গড়ে তুলেছে। বর্তমানে এসব বসতিতে প্রায় ৭ লাখ ইসরায়েলি বসবাস করছেন।২০২২ সাল থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই বছর ডানপন্থী ও বসতিপন্থী জোটের নেতৃত্বে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের সময় বসতি নির্মাণের এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে।এর একটি উদাহরণ পশ্চিম তীরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জোফিম বসতি। বিবিসি ভেরিফাইয়ের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সাল থেকে জোফিমে প্রায় ১৮৫টি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করা বসতিগুলোর একটি হলো ই১ প্রকল্প। প্রকল্পটির অবস্থান ও এর আশপাশের এলাকার মানচিত্র দেখলেই এর গুরুত্ব বোঝা যায়।এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং পূর্ব জেরুজালেম বাকি পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।প্রকল্পটির বিরোধীদের মতে, এর ফলে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ আরও কঠিন হবে। কারণ পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে রামাল্লা, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে সংযুক্ত করে একটি ধারাবাহিক ফিলিস্তিনি নগর এলাকা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হবে।ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণবিরোধী সংগঠন ‘পিস নাউ’ এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে। সংগঠনটির দাবি, আগামী অক্টোবরের নির্বাচনের আগেই সরকার ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি করতে চাইছে। এতে পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে নির্মাণকাজ বাতিল করতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।শুধু বসতি সম্প্রসারণ নয়, গত কয়েক বছরে পশ্চিম তীরের প্রশাসনের বড় একটি অংশ সামরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন একটি বেসামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে দেওয়া হয়েছে।এর ফলে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন বসতির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এসব সড়ক অনেক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলোর মধ্যকার যোগাযোগও বিভক্ত করছে।স্মোট্রিচের মতে, এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে বসতিগুলো শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠে। চলতি বছরের মে মাসে ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরে নতুন সড়ক নির্মাণে এক বিলিয়ন শেকেলের বেশি অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেয়।সরকারের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই অর্থ বরাদ্দের উদ্দেশ্য পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা। বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৩৬ কোটি ডলার বা ২৪ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড।এদিকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও বেড়েছে। সম্প্রতি বসতি স্থাপনকারীরা দুটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘেরাও করে সেগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ইসরায়েলি বসতির অন্যতম সমর্থক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই ঘটনাকে ‘অপরাধমূলক ও সন্ত্রাসী কাজ’ হিসেবে নিন্দা করেছেন।সার্বিকভাবে এসব ঘটনায় পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, পশ্চিম তীরে চলমান পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বাস্তবে অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ইসরায়েলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর বক্তব্যেও এমন পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।২০২৪ সালে এক বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেছিলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েল যে নামে উল্লেখ করে, সেই ‘জুডিয়া ও সামারিয়ায়’ ই১ প্রকল্পের নির্মাণকাজ প্রথমে বাস্তবে এবং পরে আইনের মাধ্যমে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের লক্ষ্য হলো একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যর্থ করে দেওয়া।’ই১ প্রকল্পের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহ্বানের খবর এমন সময়ে এসেছে, যখন ইসরায়েলে গুরুত্বপূর্ণ ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত