প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস সংকটে কারখানায় ছুটি, কোথাও বন্ধ উৎপাদন
স্টাফ রিপোর্টার। ||
গ্যাস সরবরাহে তীব্র সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকদের আকস্মিক ছুটি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোনো কোনো কারখানায় পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।নরসিংদীর পাঁচদোনা ইউনিয়নের তালহা টেক্স প্রো. লিমিটেডও গ্যাস সংকটে পড়েছে। গত বুধবার হঠাৎ করে কারখানাটির শ্রমিকদের ছুটি ঘোষণা করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ায় দুই দিনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখা হবে। এই ছুটি পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলেও জানানো হয়।কারখানাটির শ্রমিকদের ভাষ্য, গ্যাস সংকটের কারণে এর আগেও কয়েক দফা তাদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল শনিবার কারখানা চালু হওয়ার কথা থাকলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় ছুটি আরও বাড়িয়ে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত করা হয়েছে।তালহা টেক্সের মতো গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও অনেক কারখানাকে গ্যাস সংকটের কারণে আকস্মিক ছুটি দিতে হয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলের ২০টি কারখানায় একযোগে ছুটি ঘোষণা করা হয়। গ্যাসের তীব্র সংকটে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে।তবে শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত নয়। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মধ্যে জীবন-জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এর ফলে রাতারাতি দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গৃহস্থালির রান্নায়ও ব্যাপক ভোগান্তি শুরু হয়।শিল্পকারখানার জ্বালানির প্রধান উৎস গ্যাস হলেও এ সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত ঠিক কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে শিল্প সংগঠন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে গ্যাস সংকটের কারণে শতাধিক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন না থাকায় প্রায় সমপরিমাণ কারখানা তাদের শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। এতে বড় একটি অংশের শ্রমিক বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়েছেন।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, ময়মনসিংহ, ভালুকা, ত্রিশাল, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, শুধু নরসিংদীতেই ছোট-বড় শতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিত্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাতসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্প রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সীমিত আকারে উৎপাদন চালু রেখেছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল ১২টি সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, গ্যাসের ঘাটতির কারণে উৎপাদন চালু রাখতে কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থ দিয়ে বেশি দামে ডিজেল, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি কিনেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কারখানাগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।তালহা টেক্স প্রো. লিমিটেডের পক্ষে জাবের-জোবায়ের গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক সিফাত হোসেন ফাহিম বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে গত এক মাসে অন্তত ১৫ দফা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে তাদের উৎপাদন প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছে। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে কারখানা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তিনি। সংকট দ্রুত সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।এদিকে গত জুন মাসে গাজীপুরে দুটি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। চলতি মাসে আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানা ৫৬৫ শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ব্যাংক অর্থায়নের ঘাটতি ও কাজের সংকটকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।শিল্প পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুরে গ্যাস সংকটের কারণে চলতি মাসেই প্রায় ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে অথবা অতিরিক্ত ছুটি দিয়ে কার্যক্রম সীমিত করেছে। এর ফলে সামনে দেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে আগে থেকেই গ্যাস সংকট ছিল। তবে গত প্রায় ২০ দিনের পরিস্থিতি ছিল নজিরবিহীন। দেশের বিভিন্ন এলাকার কারখানায় গ্যাসের চাপ কোথাও শূন্যে, আবার কোথাও এক পিএসআইয়ে নেমে গিয়েছিল। অথচ উৎপাদন চালু রাখতে কমপক্ষে তিন থেকে চার পিএসআই চাপ প্রয়োজন। তিনি জানান, তার নিজের কারখানাও প্রায় ২০ দিন বন্ধ ছিল।বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন না থাকায় কারখানাগুলোর আয় বন্ধ হয়ে যাবে। তখন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়া এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে কারখানার মালিকরা দেউলিয়া হয়ে যেতে পারেন। এর ফলে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বেকারত্বের চাপ বাড়বে।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত