প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
মেয়েটা কি আমাকে চিনবে’, মুক্তির পর বাবার কষ্টের কথা রাশেদুলের
স্টাফ রিপোর্টার। ||
নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়ার পর দীর্ঘ কারাবাসের সময়ের কষ্ট ও সাত বছর বয়সী মেয়েকে কাছে না পাওয়ার বেদনা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন আসামি কামরুন নাহার মণির স্বামী রাশেদুল আলম খান।গত সোমবার নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, বাবা হয়েও এখনো বাবা হওয়ার স্বাদ পাননি। দীর্ঘদিন মেয়েকে কাছে থেকে জড়িয়ে ধরতে না পারার কষ্টের কথাও জানান তিনি।রাশেদুল আলম জানান, কঠোর নিরাপত্তার কারণে কারাগারে থাকা অবস্থায় মেয়েকে কাছে নিয়ে আদর করার সুযোগ হয়নি। জানালার ফাঁক দিয়ে মেয়ের ছোট্ট পায়ের আঙুল ছুঁয়ে দেখতেন এবং দূর থেকে মুখে হাত দিয়ে আদর করার চেষ্টা করতেন। কাশিমপুর কারাগারে যাওয়ার পর তাদের মাঝখানে প্রায় দুই ফুট দূরত্বের খাঁচা থাকায় মেয়েটি তাকে ঠিকভাবে দেখতে পারত না।তার ভাষ্য, ছোট্ট মেয়েটি ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থাকত। খাঁচার ভেতর দিয়ে ঠিকমতো দেখা না যাওয়ায় মেয়েটি তাকে চিনত না। এভাবেই সময় কেটে গেছে।রাশেদুল আরও জানান, অনেকদিন ধরে মেয়ের সঙ্গে তার দেখা হয় না। শুক্রবারেও মোবাইলে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। বুকের ভেতরের চাপা কষ্ট তিনি কখনো কাউকে বুঝতে দেননি বলেও স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন।নিজের জীবনের ক্ষতির প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, যে ক্ষতি তিনি নিজে করেছেন, কোনোদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নও তার মনে এসেছে। ২০১৯ সালে প্রশাসনের হাতে মারা গেলে কিংবা তাকে গুম করে দেওয়া হলে কী হতো, সেটিও ভাবতেন তিনি। মেয়েকে কোলে নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো আদর করার আশাতেই তিনি এতদিন অপেক্ষা করেছেন।রাশেদুল বলেন, যাদের ঝড় থেকে রক্ষা করতে ছাতা নিয়ে ঝড়ের মধ্যে ছুটেছেন, তারাও একসময় দরজা বন্ধ করে তাকে ঝড়ের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। এক দিক থেকে নয়, বিভিন্ন দিক থেকে কষ্ট পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন যেন সবকিছু সহ্য হয়ে গেছে।মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মেয়ের ফিরে আসা এবং বাবা হিসেবে প্রথম স্পর্শ ও প্রথম আলিঙ্গমেই তার বুক ভরে যাবে। এর বাইরে তার আর কোনো চাওয়া নেই।মেয়েকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাশেদুল আলম খান জানান, চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাথির সাত বছর পূর্ণ হবে। মেয়েকে ছাড়া তিনি ১৪টি ঈদ ও সাতটি জন্মদিন পার করেছেন। মেয়ের জন্য কিছুই করতে না পারায় নিজেকে নিষ্ঠুর বাবা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।তিনি বলেন, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী আল্লাহ। তবে মেয়েটি তাকে চিনবে কি না এবং কীভাবে তার সামনে দাঁড়াবেন—তা নিয়ে তিনি অস্থিরতায় রয়েছেন।এর আগে, ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।নুসরাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার সময় কামরুন নাহার মণি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর তার প্রসববেদনা ওঠে। পরে কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন।হাসপাতালে দুই দিন বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের সান্নিধ্য পায় শিশুটি। এরপর মায়ের সঙ্গে কারাগারের অন্ধ কুঠুরিতেই তার দিন কাটে। পরবর্তীতে নিম্ন আদালতের রায় শোনার সময় মণির সঙ্গে তার এক মাস বয়সী নবজাতকও ছিল।শিশুটির নাম রাখা হয় মোবাশ্বিরা খানম রাথী। মণির স্বামীর দাবি, নুসরাত জাহান রাফির নাম অনুসারে তার মেয়ের নাম রাখা হয়েছিল। তবে জানা গেছে, মণি মেয়েকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন।২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন।দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর রায় দেন হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ।রায়ে তৎকালীন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন কামরুন নাহার মণি।
সূত্র: মানবজমিন
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত