প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
জেগে উঠেছে অসংখ্য চর, জৌলুস হারিয়েছে বাঁশখালীর শঙ্খ নদী
স্টাফ রিপোর্টার। ||
দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান নদী শঙ্খ। বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এ নদীকে কেন্দ্র করে একসময় হাজার হাজার মানুষের জীবিকা চলত। শঙ্খ নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্র ইশ্বর বাবুর হাট। একসময় অত্যন্ত জমজমাট ছিল এ হাট। সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলার মানুষ ডিঙি নৌকা ও সাম্পানে করে এখানে বাজার করতে আসতেন।সে সময় ইশ্বর বাবুর হাট দক্ষিণ চট্টগ্রামের ‘সিঙ্গাপুর’ হিসেবেও পরিচিত ছিল। শঙ্খ নদীতে শত শত জেলেপল্লির মানুষ মাছ শিকার করতেন। পাশাপাশি অসংখ্য মাঝি-মাল্লার জীবিকার অন্যতম অবলম্বন ছিল এ নদী। একসময় জৌলুসে ভরা শঙ্খ এখন দুই তীর ভাঙন এবং পাহাড়ি বালু ক্রমাগত জমে চরে পরিণত হয়েছে।নদীর দুই পাশে পলি ও বালু জমে অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। মাঝখানে রয়েছে অল্প পানির ধারা। কোনো কোনো স্থানে পানি হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে স্থানীয় কৃষকেরা চাষাবাদ করছেন। এর পাশাপাশি দখল ও দূষণেও নদীটি জর্জরিত। নাব্যতা কমে যাওয়ায় নদীকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করা হাজারো জেলে ও মাঝি-মাল্লা বেকার হওয়ার পথে।বর্তমানে শঙ্খ নদীর বাঁশখালী সীমান্তের পুকুরিয়া, তেচ্চিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিযোগিতা চলছে। এর ফলে বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের স্রোতে নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে। এতে শত শত ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়ে অসংখ্য মানুষ নিঃস্ব হচ্ছেন।জানা যায়, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম ছিল শঙ্খ নদী। নদীপথে সহজে লবণ পরিবহন করা যেত বলে দোহাজারী ও পটিয়ায় লবণশিল্প এলাকা গড়ে উঠেছিল। এখনো সেখানে কয়েকটি লবণ মিল রয়েছে।তখন নদীর প্রশস্ততা তুলনামূলক কম হলেও গভীরতা ছিল বেশি। সারা বছরই নদীতে পানি থাকত। বান্দরবান থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা পর্যন্ত নদীপথের বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থানে অসংখ্য নৌকা, সাম্পান ও ইঞ্জিনচালিত বোট চলাচল করত। ছোট ছোট বাণিজ্যিক জাহাজও সেখানে ভিড়ত। ব্যবসায়ীরা এসব নৌযানে পণ্য পরিবহন করতেন।তবে নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্তমানে শঙ্খ নদীর অনেক অংশে ডিঙি নৌকাও চলাচল করতে পারে না। সময়ের সঙ্গে নদীর প্রশস্ততা বাড়লেও কমেছে গভীরতা।এ কারণে শীত মৌসুমে নদীতে পানির পরিমাণ কমে যায়। নৌকা চালাতে না পেরে হাজার হাজার মাঝি বেকার হয়ে পড়েছেন। নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থাও প্রায় হারিয়ে গেছে। কেবল বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল নামলে নদীটি আবার পানিতে ভরে ওঠে এবং তার পুরোনো রূপ ফিরে পায়।শঙ্খতীরবর্তী এলাকার ৮৭ বছর বয়সী বাসিন্দা মফজল আহমদ জানান, একসময় শঙ্খ নদীর বুকজুড়ে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় হাজার হাজার জেলে মাছ ধরতেন। বাঁশখালী থেকে নদীপথে নৌযানের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য দোহাজারীতে আনা হতো। পরে সড়ক ও রেলপথে সেসব পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানো হতো।একইভাবে বিভিন্ন এলাকার মানুষ দোহাজারীতে এসে সেখান থেকে সড়ক ও রেলপথে নিজেদের গন্তব্যে যেতেন। নদী পারাপারের জন্য বিভিন্ন স্থানে খেয়াঘাটও ছিল।বর্তমানে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই দুই কূল পানিতে তলিয়ে যায়। বাড়িঘরে পানি উঠে পড়ে। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় মানুষ।ইশ্বর বাবুর হাটসংলগ্ন জলদাসপাড়ার বাসিন্দা ৮২ বছর বয়সী গোপাল জলদাস জানান, মিঠাপানির শঙ্খ নদী ছিল বিভিন্ন সুস্বাদু মাছের অন্যতম প্রজননক্ষেত্র। এ নদীর মাছ ধরে তার পূর্বপুরুষসহ হাজার হাজার জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করেছেন।তার ভাষ্য অনুযায়ী, শঙ্খ নদীতে চিংড়ি, চিরিং, বাইলা, বোয়াল, রুই, কাতাল, পাঙ্গাস, আইড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু আগের সেই দৃশ্য এখন আর নেই।গত কয়েক বছর ধরে একশ্রেণির ব্যক্তি নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি নদীর দুই তীরে উৎপাদিত বিভিন্ন সবজির ক্ষেতে ব্যবহৃত কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মাছের পোনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।পুকুরিয়া ইউনিয়নের ফরিদ আহমদ মেম্বার বলেন, অপরিকল্পিতভাবে নিয়মিত বালু উত্তোলনের কারণে শঙ্খ নদীর তীর প্রতিনিয়ত ভাঙছে। সম্প্রতি নুরুল কবির, রুহুল কবির, আজিজুল হক ও আবদুল মোনাফের ঘর নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। চোখের সামনে তাদের চারটি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।তিনি বলেন, দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি পরিকল্পিত ও টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে বাঁশখালীর মানচিত্র থেকে পুকুরিয়া ইউনিয়ন হারিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে নদী ড্রেজিং করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অপু দেব জানান, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বান্দরবান, চন্দনাইশের ধোপাছড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ে অতিরিক্ত গাছ কাটার কারণে পাহাড়ের শক্ত মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদীতে এসে পড়ছে। এতে নদীর কিছু অংশের গভীরতা কমে গেছে।নদীশাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডলু ও সাঙ্গু নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় শঙ্খ নদীর বিভিন্ন স্থানে ড্রেজিং কার্যক্রম চলছে। তবে কিছু এলাকায় স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ড্রেজিংয়ের পরিবর্তে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত