প্রিন্ট এর তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
ক্লাস শেষে যে ঠিকানায় জমে নোবিপ্রবির প্রাণের আড্ডা
ওমর ফারুক , নোবিপ্রবি প্রতিনিধি ||
ক্লাসের ঘণ্টা শেষ হয়েছে। একাডেমিক ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। কারও গন্তব্য হল, কারও মেস; আবার কারও পা আপনাআপনিই এগিয়ে যায় ক্যাম্পাসের পরিচিত এক ঠিকানার দিকে। হাতে এক কাপ চা, পাশে প্রিয় বন্ধুরা- এরপর শুরু হয় গল্প। কেউ হাসছেন, কেউ তর্কে মেতেছেন, কেউ গিটার হাতে গেয়ে উঠেছেন প্রিয় কোনো গান। সারাদিনের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর ব্যস্ততার বাইরে এ যেন একটু স্বস্তির জায়গা।এই জায়গাটিই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত ‘শান্তিনিকেতন’ নামে।কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, ময়নাদ্বীপ ও মেডিকেল সেন্টারের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই স্থানটি এখন আর কেবল কয়েকটি বেঞ্চ কিংবা কয়েকটি দোকানের সমষ্টি নয়। সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের আড্ডা, বন্ধুত্ব, হাসি-আনন্দ আর অসংখ্য স্মৃতির এক অনানুষ্ঠানিক ঠিকানা।যেখানে ক্লাস শেষে ফেরে প্রাণ: নোবিপ্রবিতে টিএসসির মতো নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্র না থাকলেও শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রয়োজনেই শান্তিনিকেতনকে আপন করে নিয়েছেন। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা ক্লাস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে অনেকেই ছুটে আসেন এখানে।কেউ বেঞ্চে বসে গল্প করছেন, কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দিনের নানা ঘটনা ভাগ করে নিচ্ছেন। কেউ আবার বই-খাতা খুলে পড়াশোনায় ব্যস্ত। এক পাশে ছবি তোলার ব্যস্ততা, অন্য পাশে গিটারের সুর—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই শান্তিনিকেতনের দৃশ্যপট বদলে যায়।এখানেই অনেকের নতুন বন্ধুত্বের শুরু। সিনিয়র-জুনিয়রের পরিচয় হয়, একে অন্যের সঙ্গে গল্প জমে, কেউ পরামর্শ দেন, কেউ শোনেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক গণ্ডির বাইরে এই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগই ধীরে ধীরে তৈরি করে সম্পর্কের অন্য এক জগৎ।বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন বলেন, “শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রের মতো। ক্লাস শেষে এখানে না এলে যেন একটা কিছু বাদ পড়ে যায়। সবাই এখানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আসে। গল্প-আড্ডার মধ্যে সারাদিনের ক্লান্তি ও বিষণ্নতা অনেকটাই দূর হয়ে যায়। যেহেতু আমাদের টিএসসি নেই, তাই একসঙ্গে বসা ও সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”আড্ডার সঙ্গে ছোট্ট এক বাজার:শান্তিনিকেতনের ব্যস্ততা শুধু আড্ডাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে দুপুরের পর শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বাড়তে থাকলে জায়গাটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। আশপাশের দোকানগুলোতে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের খাবার ও পানীয়। ক্লাসের ফাঁকে কেউ নাস্তা সারছেন, কেউ বন্ধুদের নিয়ে বসে চা খাচ্ছেন। আবার শিক্ষার্থীদের কেউ বিক্রি করছেন জার্সি, কেউ শাড়ি-কসমেটিকস, কেউবা খাবার ও জুস। ফলে শান্তিনিকেতনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট্ট এক ব্যস্ত বাজারের আবহ। তবে এই ব্যস্ততার মধ্যেও জায়গাটির মূল আকর্ষণ-মানুষ। পরিচিত মুখ, হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া বন্ধু, দীর্ঘদিন পর দেখা সিনিয়র কিংবা নতুন পরিচিত কোনো জুনিয়র-সব মিলিয়ে এখানে প্রতিদিনই যেন তৈরি হয় নতুন কোনো গল্প।স্মৃতির পাতায় শান্তিনিকেতন:শান্তিনিকেতনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুধু প্রতিদিনের আড্ডা নয়, শিক্ষার্থীদের বিশেষ কিছু মুহূর্তও। কখনো চড়ুইভাতি, কখনো ছোট পরিসরের সাংস্কৃতিক আয়োজন, কখনো ব্যাচের বন্ধুরা মিলে রান্নাবান্না-তারুণ্যের নানা আয়োজনের সাক্ষী হয়ে আছে জায়গাটি।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুস সালাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমাদের ব্যাচের প্রথম চড়ুইভাতির আয়োজনটি শান্তিনিকেতনে হয়েছিল। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পা রাখার পর সবাই একসঙ্গে ক্যাম্পাসে এসে রান্নাবান্না করা, শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো এবং পুরো সময়টা একসঙ্গে কাটানো-সবকিছু মিলিয়ে আয়োজনটি আমাদের জন্য খুবই প্রাণবন্ত ছিল। নতুন জীবনের শুরুতে সেই দিনটি এখনো আমার কাছে বিশেষ একটি স্মৃতি হয়ে আছে।”একটি জায়গা কখনো শুধু জায়গা থাকে না। মানুষের হাসি, গল্প, আনন্দ আর আবেগ সেখানে জমতে জমতে একসময় সেটিই হয়ে ওঠে স্মৃতির অংশ। শান্তিনিকেতনের ক্ষেত্রেও যেন তাই হয়েছে।প্রকৃতির ছোঁয়ায় অন্যরকম আবহ:শান্তিনিকেতনের বিশেষত্ব শুধু মানুষের আনাগোনায় নয়; এর চারপাশের প্রকৃতিও জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। পাশের ময়নাদ্বীপ থেকে ভেসে আসে পাখির কলকাকলি। বিকেলের নরম আলো এসে পড়ে বেঞ্চগুলোর ওপর। বর্ষার দিনে টিনের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখারও আলাদা আনন্দ আছে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, ভেজা বাতাস আর চারপাশে পরিচিত মুখ-সব মিলিয়ে তখন তৈরি হয় এক অন্যরকম ক্যাম্পাসচিত্র।ব্যস্ত একাডেমিক জীবনের বাইরে প্রকৃতির এমন ছোট ছোট মুহূর্তও শিক্ষার্থীদের কাছে শান্তিনিকেতনকে আরও আপন করে তুলেছে। দিনের শেষে কমে কোলাহল, থেকে যায় গল্প:সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে আসে কোলাহল। কেউ হলের পথে হাঁটেন, কেউ মেসে ফেরেন, কেউবা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। বেঞ্চগুলোও একসময় ফাঁকা হতে শুরু করে।কিন্তু শান্তিনিকেতনের গল্প কি সত্যিই থেমে যায়?পরদিন আবার ক্লাস শেষে সেখানে ফিরে আসে পরিচিত মুখগুলো। কেউ আগের দিনের অসমাপ্ত গল্প শেষ করেন, কেউ নতুন কোনো গল্প শুরু করেন। কখনো হাসি, কখনো গান, কখনো নিছক নীরব বসে থাকা—এভাবেই দিনের পর দিন জায়গাটি হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এক অনিবার্য অংশ।বিশ্ববিদ্যালয়জীবনও একদিন শেষ হবে। চার বছরের পরিচিত মুখগুলো ছড়িয়ে পড়বে দেশের নানা প্রান্তে। বেঞ্চগুলোতে বসবে নতুন প্রজন্ম। নতুন শিক্ষার্থীরা নতুন বন্ধুত্ব গড়বে, নতুন গল্প লিখবে। তবু পুরোনোদের স্মৃতিতে হয়তো থেকে যাবে শান্তিনিকেতনের কোনো এক বিকেল। মনে পড়বে বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া নাস্তা, এক কাপ চায়ের আড্ডা, গিটারের সুরে গলা মেলানো কিংবা কোনো এক বৃষ্টিভেজা দুপুর। কারণ ক্যাম্পাসজীবনের বড় স্মৃতিগুলো অনেক সময় তৈরি হয় বড় কোনো আয়োজনে নয়; তৈরি হয় এমনই কোনো পরিচিত বেঞ্চে, প্রিয় কয়েকজন মানুষের পাশে বসে। আর নোবিপ্রবির অনেক শিক্ষার্থীর কাছে থেকে সেই বেঞ্চ, সেই আড্ডা আর সেই বিকেলের নাম- শান্তিনিকেতন।
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত