প্রিন্ট এর তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬
হাটহাজারী মাদ্রাসা পরিদর্শনে ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী
স্টাফ রিপোর্টার। ||
ব্যক্তিগত আগ্রহে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা পরিদর্শন করেছেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। গতকাল শনিবার (২৯ আগস্ট) তিনি মাদ্রাসাটিতে গিয়ে এর শিক্ষা কার্যক্রম, দাওয়াহ ও দ্বীনি খেদমতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত হন। এ সময় জামিয়ার ঊর্ধ্বতন উস্তাদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং মতবিনিময় করেন তিনি।বিকেল ৩টার দিকে প্রতিমন্ত্রী জামিয়ার ক্যাম্পাসে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান দারুল উলূম হাটহাজারীর উস্তাদ মাওলানা আনওয়ার শাহ আযহারী, মাওলানা মুনির আহমদ, মাওলানা শফিউল আলম ও মুহাম্মদ জাহিদ হোসেন।পরে প্রতিমন্ত্রী জামিয়ার মহাপরিচালকের কার্যালয়ে যান। সেখানে মহাপরিচালকসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন উস্তাদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামিয়ার মহাপরিচালক হযরত আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.), শায়খুল হাদীস ও সদরুল মুদাররেসীন হযরত আল্লামা শেখ আহমদ (দা.বা.), শায়খে সানী হযরত আল্লামা শোয়াইব জমিরী (দা.বা.), মুহাদ্দিস আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন (দা.বা.), আল্লামা মুহাম্মদ ওমর কাসেমী (দা.বা.), আল্লামা আহমদ দীদার কাসেমী (দা.বা.), আল্লামা আশরাফ আলী নিজামপুরী (দা.বা.)সহ অনেকে।সালাম ও কুশল বিনিময়ের পর প্রতিমন্ত্রী জামিয়ার শিক্ষা কার্যক্রম এবং দাওয়াহ-খেদমত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় তাকে দারুল উলূম হাটহাজারীর বিভিন্ন দাওয়াহ কার্যক্রম, অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে আবাসিক সুবিধা, দরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খোরাকী এবং একাডেমিক কিতাবপত্র সরবরাহের বিষয়গুলো জানানো হয়।এ ছাড়া জামিয়ার বিভিন্ন দ্বীনি ও মানবিক খেদমতের বিষয়েও তাকে অবহিত করা হয়। প্রতি বছর জামিয়া থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার আলেম ফারেগ হন—এ তথ্যও জানানো হয়। এসব কার্যক্রম সম্পর্কে জেনে প্রতিমন্ত্রী অভিভূত হন।মতবিনিময়ের এক পর্যায়ে আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন (দা.বা.) প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলমান হানাফী মাযহাবের অনুসারী। ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আক্বীদাগত বিষয়ে দেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ মুসলমানদের একটি অংশের মধ্যে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও তিনি প্রতিমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন।জবাবে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন বলেন, এশিয়া মহাদেশের মুসলমানদের বড় একটি অংশ হানাফী মাযহাব অনুসরণ করেন। তিনি জানান, তার দাদার পরিবার হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং নানার পরিবার আহলে হাদীস অনুসরণ করতেন।তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের দ্বীনি শিক্ষার প্রসার এবং দাওয়াহ কার্যক্রমে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার গৌরবময় ভূমিকার প্রতি তার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের যেকোনো খেদমত ও সহযোগিতায় আমাকে পাশে পাবেন।’ধর্মপ্রতিমন্ত্রী বলেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং সব ধর্ম ও মতের মানুষ যেন পারস্পরিক সহনশীলতা, শান্তি ও স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক জীবনযাপন করতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা করা মন্ত্রণালয়ের অন্যতম দায়িত্ব। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রভাব, মর্যাদা ও সুযোগ কখনোই কমিয়ে দেওয়া যায় না।তিনি আরও জানান, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে তাকে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে হতে পারে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে এসব অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতিকে যেন ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা না হয়, সে বিষয়ে তিনি উপস্থিত আলেমদের প্রতি অনুরোধ জানান।মতবিনিময়ের সময় দারুল উলূম হাটহাজারীর পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা কামনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কার্যকর করা, বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কওমি আলেমদের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক পদে কওমি আলেমদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা এবং দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রাপ্ত অনুদানকে সব ধরনের ট্যাক্স ও আয়কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া।এ ছাড়া তাবলীগ জামাআতের বিভ্রান্ত গোষ্ঠী সাদপন্থীদের বিশ্ব ইজতিমা আয়োজন এবং দাওয়াত ও তাবলীগের কার্যক্রম ঘিরে চলমান সব ষড়যন্ত্র বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও প্রতিমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।দারুল উলূম হাটহাজারীর পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিষয়গুলো প্রতিমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সরকারি বিধি-বিধানের আওতায় সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।মতবিনিময়ের একপর্যায়ে নবনিযুক্ত ধর্মপ্রতিমন্ত্রী জামিয়ার ঊর্ধ্বতন উস্তাদ ও কর্মকর্তাদের সামনে একটি বিশেষ প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নির্বাচিত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা বিনিময়, সামরিক-বেসামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্বল্পমেয়াদি উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ ‘ক্যাপস্টোন কোর্স’ আয়োজন করা হয়।তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণ গ্রহণের পদ্ধতি, সদস্যদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রক্রিয়া, দেশ রক্ষার প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন নিয়ম ও বিধি অনুসরণের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ধারণা পান।এই প্রসঙ্গে তিনি প্রস্তাব দেন, দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসাসহ দেশের অন্যান্য বৃহৎ মাদ্রাসা বছরে এক বা দুবার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও দল-মতের নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে ‘ক্যাপস্টোন কোর্স’-এর আদলে কোনো উদ্যোগ নিতে পারে। সেখানে দ্বীনি শিক্ষা কার্যক্রম, দাওয়াহ এবং ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি অনুশীলনের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।প্রতিমন্ত্রীর মতে, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দল-মত ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ইসলাম সম্পর্কে প্রচারিত বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের যথাযথ জবাবও তুলে ধরা যাবে।প্রায় ৪০ মিনিটের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় শেষে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন দারুল উলূম হাটহাজারীর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) ও কায়েদে মিল্লাত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর মাকবারাহ জিয়ারত করেন।এরপর তিনি দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে বিদায় নিয়ে মেখল হামিউচ্ছুন্নাহ মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা হন।উল্লেখ্য, ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনের ব্যক্তিগত আগ্রহে আয়োজিত এ পরিদর্শনে দারুল উলূম হাটহাজারী কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের অতিরিক্ত আবেগ-উচ্ছ্বাস বা আনুষ্ঠানিকতার বাড়াবাড়ি না করে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবগাম্ভীর্য, সংযম ও স্বাভাবিক সৌজন্য বজায় রেখে তাকে স্বাগত জানায়। একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের এ দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
সূত্র: ইরশাদ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত