প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দ্বিগুণের বেশি বাড়ল সরকারি বেতন, সর্বনিম্ন ২০ হাজার সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
স্টাফ রিপোর্টার। ||
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সময়োপযোগী করতে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় আগের মতো ২০টি বেতন গ্রেড রাখা হলেও প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। নতুন কাঠামোটি গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।নতুন বেতন কাঠামোয় আগের স্কেলের তুলনায় দুটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো পেনশনভোগীদের নিট পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ব্যবস্থা। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে—এমন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এ বিষয়ে ব্রিফিং করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এ সময় প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সংশ্লিষ্ট বেতন কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সচিব কমিটি সুপারিশ তৈরি করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে দেশের আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বর্তমানে যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে এর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের ব্যবধানও কিছুটা কমানো হয়েছে। বিদ্যমান ১:৯.৯৪ অনুপাত কমিয়ে ১:৭.৮ করা হয়েছে। এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।তিন ধাপে বাস্তবায়নঅর্থনৈতিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় নিয়ে একবারে পুরো বেতন স্কেল কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। অন্যদিকে ভাতাগুলো ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে একইভাবে তিন ধাপে কার্যকর করা হবে।নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে স্বল্প আয়ের সরকারি কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা অগ্রাধিকার পাবেন।নতুন কাঠামোর আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হবে।কোন গ্রেডে কত বেতননতুন স্কেলে প্রথম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। দ্বিতীয় গ্রেডে ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। তৃতীয় গ্রেডে ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।চতুর্থ গ্রেডে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে ৮৬ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৪৬ হাজার টাকা এবং নবম গ্রেডে ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে।দশম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২ হাজার টাকা করা হয়েছে। ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এই দুই গ্রেডেই বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ।এর পরের গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ১২তম গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, যা প্রায় ১১৫ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা করা হয়েছে, বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ।১৪তম গ্রেডের বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার টাকা করা হয়েছে, অর্থাৎ বৃদ্ধি ১৩০ শতাংশ। ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, যা ১৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি।১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৯০০ টাকা করা হয়েছে। এ গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১৩৫ শতাংশ। ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, অর্থাৎ ১৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি।১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১৩৯ শতাংশ। ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ টাকা, অর্থাৎ ১৪১ শতাংশ বৃদ্ধি।সবশেষে ২০তম গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে প্রারম্ভিক মূল বেতন বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ।অর্থাৎ উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিগুণ হলেও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে ২০তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ।পেনশনেও পরিবর্তননতুন বেতন কাঠামোয় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সরকার ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ‘One Rank One Pension (OROP)’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রে একই সঙ্গে এটি বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় আপাতত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।বয়স্ক পেনশনভোগীদের জীবনযাত্রার মান ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্ল্যাব অনুযায়ী নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। ৯ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বৃদ্ধি ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি হারে বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।সব গ্রেডে মোবাইল ভাতাসরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রথমবারের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেলেও নতুন বেতন স্কেলে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ সুবিধার আওতায় আসবেন।সরকারের হিসাবে, নতুন বেতন কাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্যম বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে। মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করা হয়েছে।এর আগে ২০১৫ সালে সর্বশেষ অষ্টম পে-স্কেল চালু করেছিল তৎকালীন সরকার। এর ১১ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো পেলেন সরকারি চাকরিজীবীরা। ওই সময়ও বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।বিশেষজ্ঞদের মতসাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, নতুন বেতন কাঠামো আরও আগেই করা প্রয়োজন ছিল।তবে এর কারণে বেসরকারি খাতেও এক ধরনের চাপ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন। মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্র, এমনকি সংবাদমাধ্যমেও নতুন বেতন কাঠামো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় কমাতে অপ্রয়োজনীয় জনবল কমানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে সংকটের কোনো শেষ নেই এবং এসব অনেক পুরোনো। সেগুলোর সমাধান না করে সংকটময় সময়ে সরকারি খাতে বেতন বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।তার মতে, এর মাধ্যমে সরকার আবারও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। নতুন পে-স্কেল শুধু বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের আর্থিক চাপও আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত