প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের ৭১ কোটি টাকার সরকারি কাজ
স্টাফ রিপোর্টার। ||
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল বগুড়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডকে ২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকার একটি কাজের চুক্তি দেয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর শাহে আলম শপথ নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর এ চুক্তি দেওয়া হয়।চুক্তিসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডের শতভাগ শেয়ারের মালিক প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ও তার ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত।তবে এই চুক্তির সঙ্গে শাহে আলমের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময়ের। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দরপত্রটি প্রকাশ করা হয়েছিল। খাবার লবণে আয়োডিন যুক্ত করার কাজে ব্যবহৃত পটাশিয়াম আয়োডেট কেনার জন্য ওই দরপত্র আহ্বান করা হয়।সে সময় শাহে আলম শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর, ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর ব্যবসায়ী ও বগুড়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহে আলমকে বিসিকের পরিচালক করা হয়। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।একাধিক চুক্তির নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস এবং শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের মালিকানাধীন মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং বিসিক ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের (এলজিআরডি) স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ৭১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের অন্তত ১২টি কাজ পেয়েছে।শাহে আলম বিসিকের পরিচালক থাকা অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় ৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ছয়টি চুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার ছয়টি চুক্তি দেওয়া হয়।এই ১২টি চুক্তির মধ্যে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস পেয়েছে দুটি এবং মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং পেয়েছে ১০টি।সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিষয়টি স্পষ্টতই স্বার্থের দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে। তার মতে, সন্তান ছাড়াও কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের সদস্য কিংবা স্বজনদের তার কর্তৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ থেকে দূরে থাকা উচিত।ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা আরও বলেন, আগের সরকারগুলোর সময়ে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি ব্যাপক ছিল। তবে সরকারি দরপত্রে স্বজনপ্রীতি মানুষ দেখতে চায় না। প্রকাশিত তথ্যগুলো সঠিক হলে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দুটি সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন কাজের চুক্তি পেতে শাহে আলম তদবির করেছিলেন।সংবিধানের ১৪৭(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ওই অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য এমন কোনো পদে থাকা ব্যক্তি লাভজনক বা বেতনযুক্ত অন্য কোনো পদে থাকতে পারবেন না। পাশাপাশি মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো কোম্পানি, সমিতি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কিংবা পরিচালনায়ও অংশ নিতে পারবেন না।দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে শাহে আলম অবশ্য এসব চুক্তির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকার বিষয়টি জোরালোভাবে অস্বীকার করেন। নিজের পদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান বাছাই বা কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তিনি নাকচ করেন।প্রতিমন্ত্রীর দাবি, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তার ছেলের প্রতিষ্ঠান এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল। তবে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়ের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করতে পারবে কি না—এ প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।সাবেক সচিব আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেন, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সন্তানরা তাদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখলে সেটিকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বলাই স্বাভাবিক। তার মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থায় সরকারি কাজ পাওয়ার বিষয়টি যেন পুরো সরকারকে প্রশ্নের মুখে না ফেলে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ঘটনায় শাহে আলম সমালোচনার মুখে পড়েছেন। গত ২৪ মার্চ আব্দুর রশীদ মিয়াকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।অভিযোগ রয়েছে, শাহে আলমের প্রভাবেই আব্দুর রশীদকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং সে সময়ের এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এই নিয়োগের বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে জানা গেছে।এলজিইডিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় আব্দুর রশীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। নিয়োগের পাঁচ দিনের মধ্যেই তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।ঘটনাটি উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, শাহে আলমের প্রভাব এতটাই ছিল যে মন্ত্রী মির্জা ফখরুলকে না জানিয়েই এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ফাইলে মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই ঘটনায় তা-ই হয়েছে।একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, শাহে আলমের প্রভাব শুধু তার নিজ মন্ত্রণালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা সচিবালয়ে নিয়মিত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।এ ছাড়া একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডেমি-অফিশিয়াল (ডিও) চিঠি দিতে সরকারি প্যাড ব্যবহারের বিষয়েও তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে।গত ১ জুলাই শাহে আলম চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেন। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই ওসিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের প্রভাব নিয়ে সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে নাম উল্লেখ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে দায়িত্বশীল এক সচিব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকার সময় পরিবারের সদস্যদের সরকারি কর্মকাণ্ডে যুক্ত না করার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। তার মতে, জিয়াউর রহমানের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও সেই নীতি অনুসরণ করা উচিত। যারা নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেন, তাদের নতুন কিছু করার প্রয়োজন নেই; শুধু জিয়াউর রহমানকে অনুসরণ করলেই হবে।৩১ আগস্ট সচিবালয়ে নিজের কার্যালয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে শিবগঞ্জ পৌরসভার উন্নয়নকাজের দরপত্র তার ছেলের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহে আলম বলেন, তার ছেলের প্রতিষ্ঠান যে পৌরসভার দরপত্র পেয়েছিল, সেটি তিনি সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগের ঘটনা। তিনি সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সময় নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি ও কার্যাদেশ দেওয়ার পর স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে হলফনামার মাধ্যমে কাজটি অন্য এক ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার ভাষ্য, কাজটি বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হলে ওই এলাকার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতো।তিনি জানান, এরপর থেকে তার ছেলে পৌরসভা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের আহ্বান করা দরপত্রে অংশ নেননি এবং বর্তমানে অংশ নিচ্ছেন না। শাহে আলম বলেন, তিনি যতদিন প্রতিমন্ত্রী বা সরকারি কোনো পদে থাকবেন, ততদিন তার ছেলের ঠিকাদারি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসা করার সুযোগ থাকা উচিত। সরকারি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তার ছেলের প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাই তার মতে, বিষয়টি স্বার্থের দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে না।তবে হলফনামার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করলেই মালিকানা পরিবর্তন হয় কি না—এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।বিসিকের পরিচালক থাকাকালে তার পরিবারের কোম্পানিগুলো সরকারি চুক্তি পাওয়ার বিষয়ে শাহে আলম বলেন, তিনি সেখানে বোর্ড সদস্য ছিলেন এবং বোর্ড সদস্যদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তিনি কোনো ক্রয় কর্মকর্তা ছিলেন না, দরপত্র আহ্বান বা অনুমোদন করেননি এবং অর্থ পরিশোধের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না।তার ভাষ্য, তার কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সেখানে কাজ পেলেও তিনি সেটিকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব মনে করেন না। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব নিয়ম ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান এবং অর্থ পরিশোধ করেছে। বহিরাগত বোর্ড সদস্য হিসেবে পুরো প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার বা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তার ছিল না বলেও তিনি মনে করেন।চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলির অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ডিও চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, তিনি এসব বিষয়ে আর কথা বলতে চান না।
সূত্র: সুখবর
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত