প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বোয়িং ক্রয়চুক্তি ও বারহাট্টার ঘোড়া
স্টাফ রিপোর্টার। ||
সম্প্রতি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের একটি এক্স পোস্ট থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে নাকি একটি ‘অভূতপূর্ব চুক্তি’ হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘আরও’ বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে নতুন করে ঠিক কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, সে তথ্য সার্জিও গোর তার পোস্টে প্রকাশ করেননি।বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বিবিসি, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে এ-সংক্রান্ত খবর পড়তে গিয়ে ছোটবেলার একটি গল্প মনে পড়ে যায়। তখন গ্রামবাংলা এখনকার মতো নাগরিক আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বিদ্যুতের বাতি না থাকলেও কুপিবাতি ও হারিকেনের আলোতেই মানুষের জীবন চলত। পথঘাট ছিল অনুন্নত ও অসমান। এখনকার মতো রিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত যানবাহনের আধিপত্যও তখন ছিল না। মালামাল বহনের ক্ষেত্রে চতুষ্পদ ঘোটক বা ঘোড়াই ছিল প্রধান ভরসা।বাংলায় গর্দভের অনুপস্থিতির কারণে ঘোড়াকেই অনেক ক্ষেত্রে গর্দভের কাজ করতে হতো। যারা ঘোড়ার পিঠে ধান-চাল পরিবহনের দৃশ্য দেখেছেন, তারা জানেন, সাধারণত ঘোড়ার দুই পাশে দুটি বস্তা রশি দিয়ে বিশেষভাবে ঝুলিয়ে বাঁধা হতো। পাশাপাশি পেটের চারপাশে একটি বেল্ট দিয়ে তা আটকানো থাকত। তবে কখনো কখনো অবিবেচক সহিস ঘোড়ার পিঠের ওপর আরও একটি বস্তা তুলে দিতেন। পরে সেটিকেও পেটের চারপাশের চ্যাপটা বেল্টের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হতো।শোনা যায়, ঘোড়ার পেটের বেল্ট যত বেশি শক্ত বা টাইট করে বাঁধা হতো, তার চলার গতি নাকি তত বেড়ে যেত। কিন্তু এতে ঘোড়ার পেটে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হতো। ফলে তার অন্ত্রে জমে থাকা বাতাস ভটভট শব্দ করে পশ্চাদ্দেশ দিয়ে বের হতে থাকত, যাকে নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষায় ‘পাদ’ দেওয়া বলা হয়।একবার নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার একেবারে উত্তরের একটি গ্রাম থেকে এক সহিস তিন বস্তা ধান ঘোড়ায় করে বিক্রির জন্য বারহাট্টা বাজারে নিয়ে আসবেন। দুটি বস্তা পর্যন্ত কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু তৃতীয় বস্তাটি ঘোড়ার পিঠে তুলে বেল্ট শক্ত করে বাঁধতে শুরু করতেই তার পশ্চাদ্দেশ দিয়ে ভটভট শব্দে বাতাস বের হতে থাকে। কিন্তু সহিস ছিলেন নাছোড়বান্দা। তিনি ঘোড়াকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন, ‘বেটা ঘোড়া, যতই পাদাপাদি করো, বারহাট্টা তোমাকে যেতেই হবে।’গত কয়েক বছরে বাংলার সাধারণ মানুষের ওপর যেভাবে একের পর এক আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি যেন সেই বারহাট্টার ঘোড়ার মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই যেন তাদের পিঠে নতুন কোনো বোঝা যুক্ত হচ্ছে। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম।ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাতে যে মূল্যবৃদ্ধির শুরু হয়েছিল, তার যেন আর শেষ নেই। কখনো পেঁয়াজের দাম বাড়ছে, কখনো সয়াবিনের। এরপর চাল, ডাল, মরিচ—একটির পর একটি নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয়ের মিটার সেই হারে কখনোই ঊর্ধ্বমুখী হয়নি। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার, ডিজেল ও পেট্রোলের ব্যয় তো রয়েছেই।সমাজজীবনের এমন বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন করে ‘আরও’ বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যার কথা লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির ধারাবাহিকতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে চলতি বছরের এপ্রিলে বিমানের সঙ্গে বোয়িংয়ের ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল।ওই চুক্তি অনুযায়ী আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট কেনার কথা রয়েছে। এই ১৪টি উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বোয়িংয়ের প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা। আর বাকি উড়োজাহাজগুলো ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।বোয়িং কেনার এ কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ক্রয়াদেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে সে সময় যাদের জন্য এসব উড়োজাহাজ কেনা হবে, সেই ‘বিমান কর্তৃপক্ষ’ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল যে, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না।এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর বিমান পরিচালনা পর্ষদের সভায় ১৪টি বোয়িং কেনার বিষয়ে ‘নীতিগত’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত একটি ‘অপ্রকাশযোগ্য বাণিজ্য চুক্তি’তে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার আগের ১৪টি উড়োজাহাজের সঙ্গে নতুন করে ‘আরও’ বোয়িং কেনার উদ্যোগ নিচ্ছে।জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসের বহরে বোয়িংয়ের মতো সম্ভ্রান্ত বংশীয় উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার কথা শুনতে ভালোই লাগে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব উড়োজাহাজ কেনার অর্থ আসবে কোথা থেকে? অর্থনীতিবিদরা হিসাব দিয়ে বলছেন, দেশের বৈশ্বিক ঋণ ইতোমধ্যে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। টাকার হিসাবে সেই অঙ্ক কত, তা হয়তো সবার মাথায় সহজে আসে না। তবে এতটুকু বোঝা যায় যে, জাতীয় ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত ঘোড়ারূপী জনগণের পিঠেই গিয়ে পড়ে।এর মধ্যেই কয়েক মাস আগে, ২০২৬ সালের জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়ছে।কৃষকের ব্যবহৃত সারের দামও বাড়ছে বলে জানা যাচ্ছে। অনেক এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত ২৩ জুলাই প্রকাশিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা সম্পর্কিত সর্বশেষ বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে পারে। এদের মধ্যে ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ আইপিসি ফেজ ৩ বা তার ওপরে, অর্থাৎ চরম জরুরি অবস্থার মুখে পড়তে পারে।অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ক্রমেই ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তবে সম্প্রতি মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ছে।২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার সময় সরকার প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল। এরপর ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪—এই তিন অর্থবছরে প্রতিবছর ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে পৌঁছেছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। (ডেইলি স্টার, ২৯ জুলাই, ২০২৬)।শুধু গ্যাস, বিদ্যুৎ কিংবা তেলের দামই নয়, মাছ, মাংস, সবজিসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই বাড়ছে। এর পাশাপাশি বাড়ছে বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ, যাতায়াত ব্যয় এবং সন্তানের লেখাপড়ার খরচ। অন্যদিকে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও ধীরে ধীরে কমে আসছে।বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে নানা কারণে পাঁচ শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কয়েক লাখ মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।এমন পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যেই সরকার প্রথমে ১৪টি এবং পরে অনির্দিষ্টসংখ্যক ‘আরও’ বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে এসব সিদ্ধান্ত ও বাড়তি ব্যয়ের চাপ কখনো সরাসরি, আবার কখনো পরোক্ষভাবে জনগণের ওপরই এসে পড়ে।ফলে বারহাট্টার সেই ঘোড়ার মতো জনগণের পশ্চাদ্দেশ দিয়ে অহর্নিশি যে ভটভট শব্দ বের হচ্ছে, তা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন তারাই, যাদের ওপর এই বোঝা চাপছে। কিন্তু সময়ের সেই অদৃশ্য সহিস যেন এখনো বলে চলেছে—‘যতই ভটভট করো না কেন, দাম আর খরচের বোঝা তোমাকে টানতেই হবে’।
সূত্র: ইত্তেফাক
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত