প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শতাব্দীতে তেলের দামে নজিরবিহীন উত্থান-পতন, আরব বসন্ত থেকে ইরান যুদ্ধ
ডেক্স রিপোর্ট। ||
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।চলতি শতাব্দীতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং মহামারিসহ বিভিন্ন ঘটনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ব্যাপক ওঠানামা হয়েছে।২০২৬: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে ফের ১০০ ডলার২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।এপ্রিলের শেষ দিকে ব্রেন্টের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ দশমিক ৪১ ডলারে পৌঁছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেলচুক্তি ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম মার্চের শুরুতে সর্বোচ্চ ১১৯ দশমিক ৪৮ ডলারে ওঠে।পরবর্তী সময়ে সংঘাত কমে আসার প্রত্যাশা, চীনের দুর্বল তেল চাহিদা এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত তেল মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার কারণে জুনে দাম কমতে শুরু করে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বন্ধের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার পর তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের নিচেও নেমে যায়।তবে আগস্টের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আবার তীব্র হয়ে উঠলে ব্রেন্টের দাম পুনরায় ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে। এ সময় ডব্লিউটিআইয়ের দাম প্রায় ৯৫ ডলারে অবস্থান করছে।ইউক্রেন যুদ্ধেও তেলের বাজারে বড় উল্লম্ফন২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রথমে ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।মার্চে ব্রেন্টের দাম বেড়ে ১৩৯ দশমিক ১৩ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ১৩০ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছায়। এই দাম ২০০৮ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি ছিল।রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার পর তেল সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা এবং করোনা মহামারির পর চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ২০২২ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। পরবর্তী সময়ে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমে আসে।২০২০: তেলের দাম নেমেছিল ঋণাত্মক ৪০ ডলারে২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় তেলের বাজারে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়। অফিস-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিমান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়।একই সময়ে তেল সংরক্ষণের জায়গার সংকট এবং সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যকার মূল্যযুদ্ধ বাজার পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলে।একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ঋণাত্মক ৪০ দশমিক ৩২ ডলারে নেমে যায়। এর অর্থ ছিল, উৎপাদকদের ক্রেতাদের তেল গ্রহণের জন্য অর্থ দিতে হয়েছিল। একই সময়ে ব্রেন্টের দামও রেকর্ড সর্বনিম্ন ১৫ দশমিক ৯৮ ডলারে নেমে আসে।ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞায় ২০১২ সালে ফের দাম বাড়ে২০১২ সালেও ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়ে তেলের বাজারে। ইউরোজোনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তেলের দাম ৯০ ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে দেশটির বিরুদ্ধে একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞাও ছিল। এর ফলে তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।সিরিয়া সংকটসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত উত্তেজনার প্রভাবে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তেলের দাম প্রায় ধারাবাহিকভাবে ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল ব্যাপক পরিমাণে বাজারে আসতে শুরু করলে ২০১৫ সালের শুরুতে দাম ৫০ ডলারের নিচে নেমে যায়।আরব বসন্তেও প্রভাব পড়ে তেলের বাজারে২০১১ সালের আরব বসন্তও আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার তেল উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ওই বছরের মার্চে ব্রেন্টের দাম বেড়ে ১২৭ ডলারে পৌঁছায়।তিউনিসিয়া, মিসর ও ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের শাসকদের পতনের পাশাপাশি লিবিয়াসহ অন্যান্য দেশে অস্থিরতা দেখা দেয়। এতে তেল সরবরাহ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়ে।২০০৮: তেলের দামে শতাব্দীর সর্বোচ্চ উত্থানচলতি শতাব্দীতে তেলের দামে সবচেয়ে বড় উত্থান দেখা যায় ২০০৮ সালে। ওই বছরের শুরুতেই প্রথমবারের মতো ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে।১১ জুলাই ব্রেন্টের দাম রেকর্ড ১৪৭ দশমিক ৫০ ডলারে উঠে যায়। একই দিনে ডব্লিউটিআইয়ের দামও সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৭ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছায়।যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত কমে যাওয়া, চীনের শক্তিশালী চাহিদা এবং ইরান ও নাইজেরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে অস্থিরতা তেলের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি ডলারের দুর্বলতাও তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।তবে কয়েক মাসের মধ্যেই বাজারের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র মন্দা দেখা দিলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্রেন্টের দাম প্রায় ৩৬ ডলারে নেমে আসে।চলতি শতাব্দীর তেলের বাজারের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বৈশ্বিক মহামারির মতো ঘটনা অল্প সময়ের মধ্যেই তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। ২০০৮ সালের প্রায় ১৫০ ডলারের রেকর্ড উচ্চতা থেকে ২০২০ সালে ঋণাত্মক দামে পতন এবং ২০২৬ ড 7আবার ১০০ ডলারের ওপরে ওঠা সেই অস্থিরতারই ধারাবাহিক চিত্র।
সূত্র: ডন7
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত