প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগেভাগেই মাঠে জামায়াত, সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার। ||
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে দলীয়ভাবে একক প্রার্থী নির্ধারণের কাজ প্রায় শেষ করেছে দলটি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই জামায়াতের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা বেশি দেখা যাচ্ছে।ইতোমধ্যে দেশের প্রায় সব ইউনিয়নে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে আনুগত্যশীল, সৎ, সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পন্ন, স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও পরীক্ষিত দায়িত্বশীলদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মনোনীত প্রার্থীরা দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সভা-সমাবেশ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ধরনের গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের মাধ্যমে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই জোট থাকছে না। স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে প্রস্তুতি শুরু করায় মাঠপর্যায়ে অন্যদের তুলনায় দলটি এগিয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। পুরুষ প্রার্থীর পাশাপাশি বিভিন্ন পদে নারী প্রার্থীও নিশ্চিত করছে জামায়াত।তবে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তার এবং ভোট সুষ্ঠু হবে কি না, তা নিয়ে জামায়াতের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। এ কারণে কেন্দ্রভিত্তিক পোলিং এজেন্ট ও প্রয়োজনীয় জনবল নির্ধারণ করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের বিভিন্ন দাবি ও আশঙ্কার বিষয়ও তুলে ধরছেন দলটির প্রতিনিধিরা। তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থীরা আরও জোরালোভাবে ভোটারদের কাছে যাবেন বলে জানা গেছে।স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম আমার দেশকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে। আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকলেও জাতীয় নির্বাচনের পর তা আরও জোরদার করা হয়েছে।তিনি জানান, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য প্রায় সব প্রার্থীই ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় নেতাদের পরামর্শের ভিত্তিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা প্রার্থী চূড়ান্ত করেন। উপজেলা ও পৌরসভার প্রার্থী নির্ধারণ করেন আঞ্চলিক দায়িত্বশীলরা। আর সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য নির্বাচনের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ চূড়ান্ত করে বলে জানান তিনি।সূত্রমতে, গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের অধীনে ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জামায়াত। এর মধ্যে ৬৮টি আসনে জয় পায় দলটি। অন্য আসনগুলোতেও দলটি ভালো ফল করে। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আরও বেশি বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য নির্বাচন নিয়েও দলটির প্রার্থীরা বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্যও প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন দলটির প্রার্থী হবেন। ডাকসুর মেয়াদ শেষ না হওয়ায় সাদিক কায়েম এখনো প্রকাশ্যে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেননি। তবে সেলিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।‘আমাদের শহর আমরাই গড়ব, ঢাকা উত্তর বদলে দেব’—এমন প্রত্যয় সামনে রেখে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়ে গণসংযোগ করছেন সেলিম উদ্দিন।তিনি বলেন, তারা নগরীকে পরিবর্তন করতে চান। সবার অংশগ্রহণ ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ঢাকা উত্তর সিটিকে আধুনিক ও মডেল নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চান। শুধু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কাজের মাধ্যমে ঢাকা শহরের পরিবর্তন আনতে চান তারা। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন বলেও জানান তিনি।এদিকে স্থানীয় নির্বাচনের বিভিন্ন পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে জামায়াত নেতাদের মধ্যে অঘোষিত প্রতিযোগিতা ও তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। তবে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছ বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা চাওয়া-পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত না মানলে দলে থাকার সুযোগও নেই। এ কারণেই একক প্রার্থী নির্ধারণ করা সহজ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।প্রার্থিতার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার কারণে সম্প্রতি খুলনার পাইকগাছার একটি ইউনিয়নের এক জামায়াত নেতার রুকনিয়াত বাতিল এবং দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা জামায়াতের আমির হাবিবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, তার উপজেলাসহ জেলার প্রায় সব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মহিলা মেম্বার প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে নিজেদের পরিচিত করছেন এবং বাজারের বিভিন্ন দোকানে গিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তফসিল ঘোষণার পর তারা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ করবেন বলেও জানান তিনি।যশোরের মনিরামপুর উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আহসান হাবিব লিটনও একই ধরনের প্রস্তুতির কথা জানান। তিনি বলেন, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৫টিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। হিন্দুপ্রধান দুটি ইউনিয়নে প্রার্থী নির্ধারণ করা হলেও এখনো ঘোষণা করা হয়নি। সব ইউনিয়নেই নির্বাচনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি চলছে এবং বিপুল ভোটে বিজয়ের প্রত্যাশা রয়েছে।প্রার্থী বাছাইয়ের যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি বলেন, জনপ্রিয়তা, সততা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় এগিয়ে থাকা দায়িত্বশীলদেরই প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রার্থীরা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ, সমাজসেবা, উন্নয়নমূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। সরকারি দলসহ অন্য দলগুলো এখনো প্রার্থী ঘোষণা না করায় জামায়াত মাঠপর্যায়ে এগিয়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।তবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথাও জানান এই নেতা। তার অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তবে এসব বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হচ্ছে। পোলিং এজেন্টের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবলও প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।এদিকে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন শঙ্কা, অভিযোগ ও দাবির বিষয় নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরছে জামায়াত। সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর দলটির নেতারা ইসিতে গিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণার দাবিও জানানো হয়।প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর আগে নির্বাচন কমিশনে সিনিয়র সচিব নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগও জানিয়েছিল জামায়াত।
সূত্র: আমার দেশ
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত