প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে কেন বাড়ল, ব্যাখ্যা আবিদের
স্টাফ রিপোর্টার। ||
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার পরও বাংলাদেশে কেন দাম বাড়ানো হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবিদুল ইসলাম খান। পাশাপাশি ইরান থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল আমদানি করা কেন সহজ নয়, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব বিষয় তুলে ধরেন আবিদুল ইসলাম খান।পোস্টে আবিদুল ইসলাম খান বলেন, রোববার রাতে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া তাঁর পোস্টের মন্তব্যের ঘরে অনেকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর মধ্যে দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। প্রথম প্রশ্নটি হলো—বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে, তাহলে বাংলাদেশে দাম বাড়ল কেন?এর ব্যাখ্যায় তিনি জানান, চলতি মাসের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ১০৭ ডলার। রোববার রাতে তা নেমে দাঁড়ায় ১০০ ডলারে এবং বর্তমানে ৯৬ ডলার। অন্যদিকে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দাম ছিল ৬২ ডলার। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৪৫ ডলার বেড়ে প্রায় ১০৭ ডলারে উঠেছিল।তিনি উল্লেখ করেন, কিছু সংবাদমাধ্যমে ‘আন্তর্জাতিক বাজারে কমলো তেলের দাম’—এ ধরনের শিরোনাম দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব শিরোনামে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য নেই। তেলের বাজারের একটি ট্রেডিং চার্টও তিনি পোস্টের সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝবেন বলে উল্লেখ করেন।আবিদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আজ তেলের দাম কমলেই তার প্রভাব বাংলাদেশে একই দিনে সরাসরি অনুভূত হবে না। কারণ বাংলাদেশ নিজে তেল উৎপাদন করে না, আমদানি করে। সৌদি আরবের ইয়ানবু (Yanbu) থেকে আমদানিকৃত তেল চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সাধারণত ১৩ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। ফলে বর্তমান দামে যে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেটি ১৩ থেকে ১৫ দিন আগের দামে কেনা হয়েছে। আবার এখন দাম কমলেও সেই দামে কেনা তেল বাংলাদেশে পৌঁছাতে আরও ১৩ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। তবে সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে আসা একটি চালানে স্বাভাবিক ১৩ থেকে ১৫ দিনের পরিবর্তে প্রায় ৫০ দিন সময় লেগেছে বলেও তিনি জানান।এরপর তিনি দ্বিতীয় প্রশ্নটি তুলে ধরেন—ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে সেখান থেকে তেল আমদানি করা যায় না কেন?এর উত্তরে আবিদ বলেন, এর প্রধান কারণ হলো বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি মূলত নির্দিষ্ট ধরনের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (crude) প্রক্রিয়াজাতের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) মূলত সৌদি অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুরবান ক্রুড আমদানি করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করেছে।তিনি বলেন, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দুর্যোগের পর বিপিসি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিকল্প ক্রুড পরীক্ষা করে নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়ার ক্রুডকে রিফাইনারি-সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাই ইরানের ক্রুড সস্তা হলেই সরাসরি তা কিনে রিফাইনারিতে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ক্রুডের রাসায়নিক গঠন, রিফাইনারির কাঠামো, উৎপাদন ফলন এবং মিশ্রণের প্রয়োজনীয়তাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।আবিদ আরও বলেন, ইরানের তেল খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাংলাদেশ ইরান থেকে তেল কিনলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, ডলার লেনদেন, জাহাজ ও বীমা ব্যবস্থায় সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁর ভাষায়, যে আন্তর্জাতিক ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হবে, তারাই এতে সম্মতি নাও দিতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে সমস্যার মুখে পড়তে পারে।এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব পোশাক খাতসহ অন্যান্য রপ্তানি খাতেও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আবিদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রণালি—হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—বন্ধ রয়েছে। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে তেল নিয়ে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপে পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও হামলার কারণে বন্ধ রয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কতটা গুরুতর, তা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারছেন না।তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি এলএনজি উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি কাতারও বর্তমানে বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।আবিদ আরও বলেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণ দেখিয়ে তৎকালীন সরকার এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম ৮৯ টাকা থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছিল। তাঁর দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের পরিস্থিতির চেয়েও ভয়াবহ।তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং পাঁচ বছর পর আবারও জনগণের ভোটের মুখোমুখি হতে হবে। তাই সরকার স্বেচ্ছায় কেন অজনপ্রিয় হতে চাইবে—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তেলের দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো বিকল্প ছিল না।বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মার্চ-আগস্ট ২০২৬ সময়ের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাব উল্লেখ করে আবিদ বলেন, বিপিসির মোট লোকসান ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। ছয় মাসে গড়ে মাসে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।পোস্টের শেষাংশে আবিদ বলেন, সরকারের উচিত ছিল এসব তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং মানুষকে বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। কারণ এটি জনগণের সরকার। তাঁর মতে, বিষয়গুলো আরও গুছিয়ে উপস্থাপন করা হলে জনগণও বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করত।সবশেষে তিনি মহান আল্লাহর কাছে এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দোয়া করেন।
সূত্র: দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত