প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কালো পোশাকের ‘ফাইটার’ থেকে প্যাস্টেল স্যুটের প্রধানমন্ত্রী মেলোনি
ডেক্স রিপোর্ট। ||
একসময় ইতালির ডানপন্থি রাজনীতির প্রান্তিক কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন জর্জিয়া মেলোনি। তখন তার পোশাকে প্রাধান্য পেত কালো স্যুট ও ভারী কালো বুট, আর বক্তব্যেও থাকত কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান। তাকে অনেকটা প্রতিবাদী নেত্রীর অবয়বেই দেখা যেত। তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার রাজনৈতিক অবস্থান ও পোশাক—দুটিতেই পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে তার পরনে দেখা যায় হালকা রঙের স্যুট, ঢিলেঢালা ট্রাউজার ও উঁচু হিল। ফ্যাশন ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মেলোনির তুলনামূলক নরম, গ্রহণযোগ্য এবং একই সঙ্গে কর্তৃত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি ফুটে উঠছে।২০২২ সালের অক্টোবরে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার সময় মেলোনি গাঢ় রঙের স্যুট ও ভারী কালো বুট পরেছিলেন। তার সেই পোশাকের ধরন ইতালির ডানপন্থি রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়েছিল।বর্তমানে মেলোনি এমন এক নেতা, যিনি দেশ পরিচালনায় শুরুতে যতটা কট্টর অবস্থান নেবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন। একই সময়ে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন।এখন তাকে প্রায়ই প্যাস্টেল রঙের স্যুট এবং চওড়া ট্রাউজারে দেখা যায়। অনেক সময় সেই ট্রাউজারের নিচে তার উঁচু হিলের জুতা প্রায় ঢাকা পড়ে থাকে। ফ্যাশন ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পোশাকে তার চেহারায় কোমলতার ছাপ তৈরি হয়, তবে তা সংঘাতপূর্ণ না হয়েও কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটায়।প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেয়াদের শেষ বছরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মেলোনি এখন ডানপন্থি রাজনীতির আরেক নেতার কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। তার পোশাকের ধরন যেমনই হোক, এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছু বিষয়ে তার তুলনামূলক মধ্যপন্থি হয়ে ওঠার বিষয়টি সামনে আনতে পারে।অবশ্য পোশাকের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ শুধু মেলোনির ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামরিক ধাঁচের পোশাক পরে আসছেন। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সরকারকে শ্রমজীবী মানুষের আরও কাছাকাছি নেওয়ার নীতি তুলে ধরতে জিনস ও টি-শার্ট পরেন। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউমও স্থানীয় বয়ন ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানাতে আদিবাসী কারিগরদের তৈরি নকশিকাঁথা ও নকশা করা পোশাক পরেন।তবে ইতালির নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম নারী হিসেবে মেলোনির পোশাকের গুরুত্ব আরও বেশি হতে পারে।ইতালীয়-হাইতিয়ান ফ্যাশন ডিজাইনার স্টেলা জ্যাঁ বলেন, ‘যে নারী এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, যে দেশ ফ্যাশনের জন্য বিখ্যাত এবং যার অর্থনীতিরও এটি অন্যতম স্তম্ভ, তার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।’কর্মী থেকে প্রধানমন্ত্রীপোস্ট-ফ্যাসিবাদী শিকড় থাকা একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়ে মেলোনি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ধারণা করা হয়েছিল তিনি ইউরোপের প্রতি বিরোধিতাপূর্ণ অবস্থান নেবেন এবং পররাষ্ট্রনীতিতেও চরম অবস্থান গ্রহণ করবেন।তবে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। দেশের অভ্যন্তরে রক্ষণশীল ও অভিবাসনবিরোধী নীতি অনুসরণ করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিষয়ে তিনি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থকও তিনি।এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার মুখেও কখনো কখনো মেলোনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এ অবস্থানে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোও তার পাশে দাঁড়িয়েছে।ইতালির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিকার্ডো আলকারো বলেন, ‘যখন তিনি একটি ছোট ডানপন্থি দলের নেতা ছিলেন, তখন তার ছোট একটি ভোটারগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হতো। এখন তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বড় দেশের নেতা। তাই তাকে এমন একজন বিশ্বাসযোগ্য সরকারপ্রধান হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হয়, যার এমন কিছু ধারণা আছে, যা নিয়ে আলোচনা করা যায়।’প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অল্প সময় পর থেকেই মেলোনি পরিপাটি স্যুট এবং তুলনামূলক শান্ত রঙের পোশাক পরতে শুরু করেন। ফ্যাশন সমালোচকেরা তার এই পরিবর্তনকে মার্জিত হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে এতে তার মধ্যে গাম্ভীর্য এবং সহজে কাছে টানার মতো একটি ভাবও ফুটে ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতিও তখন বাড়তে শুরু করে। এমনকি তিনি চুলের রঙও কিছুটা হালকা করেন।ফ্লোরেন্সের ইউনিকলেজে ফ্যাশন পড়ানো মিশেলা বোনাফোনি বলেন, ‘হালকা রং আনুগত্য, কোমলতা ও মমতার ইঙ্গিত দেয়। হালকা রঙের পোশাকে মানুষকে আরও আপন করে তোলা যায়।’মেলোনির দপ্তর তার পোশাক এবং ফ্যাশন বিষয়ে তাকে কে পরামর্শ দেন, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।ইতালির রক্ষণশীল মধ্যপন্থিদের কাছে টানার চেষ্টামেলোনির বর্তমান পোশাক ও রাজনৈতিক বক্তব্য তার তরুণ বয়সের চেহারা ও অবস্থানের সঙ্গে বেশ বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করেছে।১৯৯৬ সালে মেলোনির বয়স যখন ১৯ বছর, তখন একটি ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল ডানপন্থি একটি যুব আন্দোলনের সদস্যদের সংগঠিত করার সময় তরুণ এই কর্মীকে অনুসরণ করেছিল। সে সময় প্রায় পুরোপুরি কালো পোশাক পরা মেলোনি এক সাক্ষাৎকারে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির পক্ষে কথা বলেছিলেন। ওই বক্তব্য তার রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ফেলেছে।এরপর থেকে ইতালির অতীতের সঙ্গে যুক্ত চরমপন্থা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি মেলোনিকে যুবমন্ত্রী করেন। নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি আরও গম্ভীর ধরনের পোশাক পরতে শুরু করেন। তার পোশাকে মূলত গাঢ় রঙের স্যুট ও সাদা শার্ট দেখা যেত।২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সময় মেলোনি তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এরই মধ্যে বাড়িয়ে তুলেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের এক বক্তব্যে আবেগের সঙ্গে নিজেকে ‘একজন নারী, একজন মা, একজন খ্রিষ্টান’ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। পরে এই বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি ভাইরাল রিমিক্স তৈরি হয় এবং রক্ষণশীল মধ্যপন্থি ভোটারদের মধ্যে তার সমর্থন বাড়াতেও এটি ভূমিকা রাখে।প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাকে খুব কমই পুরো কালো স্যুট ও বুট পরে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। ফ্যাশনেবল দেখানোর পাশাপাশি শোকের সময়ও কালো পোশাক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে ইতালিতে এই রঙ দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদের সঙ্গেও যুক্ত।বর্তমানে মেলোনিকে প্রায় সব সময় ট্রাউজার পরতে দেখা যায়। চোখে পড়ার মতো নকশা তিনি এড়িয়ে চলেন এবং প্যাস্টেলসহ বিভিন্ন নিরপেক্ষ রঙের পোশাক পছন্দ করেন। এমনকি তার উঁচু হিলের জুতাও সাধারণত চওড়া ট্রাউজারের নিচে ঢাকা থাকে।রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলকারো বলেন, ‘তিনি যে ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চান, তার সঙ্গে তার চেহারায় কোনো সংঘাত থাকতে পারে না।’তিনি উল্লেখ করেন, মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালির ভোট ২০১৮ সালের ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে প্রায় ২৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।জার্মান চ্যান্সেলরের নজর কাড়ে টাইমেলোনির চেহারা ও পোশাকের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত হিসেবে পর্যবেক্ষকেরা ২০২৪ সালে পুগলিয়ায় অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের কথা উল্লেখ করেন।ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার দলের ভালো ফলের পর তিনি ইতালিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের স্বাগত জানান। সেদিন তার পরনে ছিল হালকা প্যাস্টেল গোলাপি স্যুট এবং পালাজ্জো প্যান্ট।ততদিনে তিনি ইউরোপের অন্যতম রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা নেতা হয়ে উঠেছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার আত্মবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছিল।চলতি বছরের ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁয়ে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনেও তার সেই আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ দেখা যায়। সেদিন মেলোনির পরনে ছিল বেইজ রঙের স্যুটের সঙ্গে একই রঙের টাই। তার এই পোশাক জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎসের নজরেও আসে।খোলা মাইক্রোফোনে মেরৎসকে মেলোনিকে বলতে শোনা যায়, ‘আজ আপনি টাই পরেছেন।’জবাবে মেলোনি বলেন, ‘হ্যাঁ, তাই আপনি আমাকে একজন যোদ্ধা হিসেবে ভাবতে পারেন।’মেলোনির পোশাকের এই পরিবর্তন তাই শুধু ফ্যাশনের বিষয় নয়। কালো স্যুট ও ভারী বুট থেকে প্যাস্টেল রঙের স্যুট ও চওড়া ট্রাউজারে তার পরিবর্তনের পথ যেন ইতালির রাজনীতির প্রান্ত থেকে ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত তার নিজের রাজনৈতিক যাত্রারও একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।
তথ্যসূত্র: এপি
কপিরাইট © ২০২৬ ইনসাফ টাইম ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত